মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

পরিত্যক্ত ডায়রি · অধ্যায় ৪/৫

পার্ট - ০৪

এক সপ্তাহ মিড টার্ম দিয়ে এখন একটু ফ্রি হলো ইন্তিহা।তাহমিনা আপুর সাথে অনেক কথা হয় এখন। দুজন আবার আগের মত ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। নামাজ পড়া, কোরআন পড়া, পর্দা করা সব ধরণের ভালো কাজেই আপু ওকে প্রচুর ইন্সপায়ার করে। নামাজটা কন্টিনিউ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ইন্তিহা। ফজর আর জোহরের নামাজটা পড়তে খুব বেশি কষ্ট হয় ওর। আর কোরআন পড়া তো ভুলেই গেছে। লাস্ট কবে যে কোরআন হাতে নিয়েছিলো, তাও মনে নেই। পর্দা করার ব্যপারটা এখনো মন থেকে মেনে নিতে পারছে না ইন্তিহা। কেন এত গরমের মধ্যেও এত কালো একটা বস্তু গায়ে দিয়ে রাখতে হবে। কেন শুধু মেয়েদেরকেই পর্দা করতে হবে। এ ধরণের হাবিজাবি অনেক কোয়েস্চেন মাথায় আসে ওর। তবু তাহমিনা আপু পর্দার ব্যপারে কিছু বললে ইন্তিহা জবাব দেয়, ” হুম করবো ইনশাআল্লাহ্!”

কফির মগটা হাতে নিয়ে, বারান্দায় এলোভেরা টবের পাশে বসলো ইন্তিহা। এলোভেরা টবটা তপু সহ কিনেছিলো, আই হসপিটালের সামনে থেকে। ভারি টবটা হাতে নিয়ে হাটতে তপুর খুব কষ্ট হচ্চিলো। একটাও রিকশা পাওয়া যাচ্ছিলো না। সব স্মৃতির খুটিনাটি সব কিছুই মনে আছে ইন্তিহার। কি মনে করে যেন ও উঠে গিয়ে আবার টবের পাশে এসে বসলো।

বারান্দার ফ্লোরে এলোভেরা টবটার পাশে বশে ইন্তিহা ডায়রি লেখা শুরু করলো।

“তপু আসলে খুব একটা খারাপ ছেলে নাহ্। এখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে হয়ত এসব করে বেড়াচ্ছে। আমি আল্লাহ্ এর কাছে দো’আ করি আল্লাহ্ যেন ওকে হেদায়াত দেন।

সেই সাথে আলহামদুলিল্লাহ্!

তপু আমার সাথে চিট না করলে হয়ত আমি কখনোই আমার রবকে চিনতে পারতাম না। আলহামদুলিল্লাহ্, আমার রব আমাকে পথ দেখাইছেন।

অনেকবার সুইসাইড করতে চেষ্টা করসি। কিন্তু পারি নাই।আলহামদুলিল্লাহ্। এটা আল্লাহরই ইচ্ছা। এখন আর সুইসাইড করার কথা ভুল করেও ভাবতে পারি নাহ্ আমি। এত কষ্ট, এত ধৈর্যের রেজাল্ট এক সেকেন্ডে শেষ করে দেয়ার কোনো ইচ্ছা বা সাহস কিছুই নাই আমার। এমনিতে আমরা অনেক ছোট বড় গুনাহ্ করে ফেলি।আল্লাহ্ চাইলে সব মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু যারা সুইসাইড করে তাদের আল্লাহ্ কখনো ক্ষমা করেন না।তাহলে কেন, কার জন্য আমি আমার সারাজীবনের ছোট বড় সব ভালো কাজগুলা এক মুহূর্তে শেষ করে দিবো?তপুর জন্য? যে এই সাময়িক পৃথিবীতেই আমাকে এত কষ্ট দিলো, তার জন্য আমি আমার আলটিমেট লাইফ কেন শেষ করবো!

মাত্র অল্প ক’দিনে মনে হচ্ছে আমার বয়সটা অনেক বেড়ে গেছে। অনেক কিছু বুঝতে পারছি আমি।

আসলে, আল্লাহ্ সব সময়ই মানুষকে পথ দেখায়। কিন্তু সে তা মানবে নাকি মানবে না সেটা তার নিজের ডিসিশন।লাইক, তপুর সাথে রিলেশন শুরুর আগে কিন্তু আমি জানতাম যে এটা হারাম। কিন্তু মানি নাই। আমার সামনে দুইটা পথই ছিলো। হয়, এটা হারাম তা মেনে নিয়ে আল্লাহ্ কে ভয় করে রিলেশনে না জড়ানো। নাহয়, না মেনে নিয়ে আল্লাহ্ এর পরোয়া না করে রিলেশনে জড়ানো। যদি মেনে নিতাম তাহলে তো, লাস্ট দুইটা বছর ওর জন্য যে কষ্টগুলা আমি পাইসি তা আমার জীবনে আসতো না। আর কেউ হয়ত আমাকে মেন্টাল পেশান্ট ভেবে সাইকোলজিস্ট দেখাতেও সাজেস্ট করতো না।ডিসিশনটা আমার ছিলো আর এর রেজাল্টও বুঝতে পারসি। এখন শুধু বার বার মনে, ইশ! তখন যদি আল্লাহ্ কে ভয় করে কোনো হারাম সম্পর্কে না জড়াতাম! কিন্তু যা হয়ে গেছে তার জন্য আল্লাহ্ এর কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

সেদিন কথার ফাঁকে, কি বলতে বলতে যেন দীপ্তি বলে উঠলো, ”তপু তোর সাথে এমন করসে! আল্লাহ্ বিচার করবে ওর! কু* একটা!”

কথাটা শুনে হঠাৎ খুব ভয় পেলাম আমি। মনে হলো আল্লাহ্ তো ন্যায়বিচারক! রিলেশন করাতে যদি আল্লাহ্ ওর বিচার করেন তাহলে তো আমারও বিচার হবে। ও আমাকে প্রোপজ করসে আর আমি এক্সেপ্ট করসি।তাহলে গুনাহ্ তো আমারও হইসে। এইসব ভেবে দীপ্তিকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আচ্ছা বাদ দে! আল্লাহ্ ওকেও মাফ করে দিক আর আমাকেও।”

একথা শুনে দীপ্তি টিটকারী দিয়ে বললো, ”হায়রেহ্ ভালোবাসা!”

আমি চুপ ছিলাম। কারণ, তখন দীপ্তিকে বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না; যে তপুকে ভালোবাসি বলে আমি এই কথা বলিনি। বরং আল্লাহ্ কে ভয় করি বলেই, বলেছি। আর দো’আ করি আল্লাহ্ যেন আমাদের দুজনকেই ক্ষমা করে দেন।

ল্যাব মিডের শেষে তপুর সাথে দেখা হইসিলো। ও হয়ত অপরাধবোধে ভুগছে। মাথা নীচু করে ৫ বছরের বাচ্চাদের মত সরি বললো। দেখে এত্ত মায়া লাগছিলো আমার।কিন্তু আমি অন্য দিকে তাকায়ে বললাম, ”তপু, নামাজ পড়ে আল্লাহ্ কে সরি বলো। আর দো’আ করো আল্লাহ্ যেন আমাদের দুজনকেই ক্ষমা করে দেন।” এটুকু বলেই আমি চলে আসছি। ওর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করি নাই। কোনো ভাবে যদি আমরা আবার শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাই! শয়তান হয়ত এখন আর আমাকে ধোঁকা দিতে পারতেছেনা, তাই ওর মনে অপরাধবোধ দেখাচ্ছে।

এখন বার বার মনে হয়, ইশ! কেন যে আগে তাহমিনা আপুর কথা শুনি নাই। আল্লাহ্ তো আমার কাছে আগেই তাহমিনা আপুকে পাঠাইছিলো। আমিই মানি নাই।

কি আশ্চর্য তাই নাহ্!

একজন মুসলিম মেয়ে হয়েও এই ২০ বছর বয়সে এসে আমি ইসলাম নতুন করে শিখতেছি। আমি কোরআন পড়া ভুলে গেছি। একটা লেটারও চিনিনা। ”ক্বুলহু আল্লাহ্” কে এই ১৫ টা বছর “কুল্ফু আল্লাহ্” পড়ে আসসি। কারো কোনো মাথা ব্যথা নাই। অথচ কোন ক্লাসে যেন আওয়ার(Hour) কে হাওয়ার বলছিলাম। আম্মু কি বকাটাযে দিছিলো। আওয়ার উচ্চারণ জীবনে আর ভুলি নাই।

আম্মুকে বলছিলাম যে আমি কোরআন পড়া আবার শিখতে চাই। কিন্তু আর হয় নাই।

“এই বয়সে তুমি হুজুরের কাছে আলিফ বা শিখবা! কি বলবে সবাই”

এইসব হাবিজাবি কথা।

আম্মুকে কোনোভাবেই বুঝাইতে পারলাম না যে কে কি বলবে তার থেকে আমার কোরআন পড়া শিখাটা বেশি ইম্পরট্যান্ট।

তারপর তাহমিনা আপুর থেকে কোরআনের অনুবাদটা এনে পড়া শুরু করছি। আরবি পারিনা তাতে কি হইছে!বাংলা তো পারি। একদিন আরবিও পারবো ইনশাআল্লাহ্।

গতরাতে সুরা ফাতেহার অর্থ পড়লাম। এতো বছর এই সূরা নামাজে কত বার পড়ছি। অথচ অর্থ কালকে জানলাম। এত সুন্দর অর্থগুলা। আজকে সকালে সুরা বাক্বারাহ্ এর অর্থ পরলাম। শেষ হয়নাই এখনো। তাও কিছু কিছু আয়াতের অর্থ পড়ে মনে হইসে ; কথা গুলা যেন আল্লাহ্ নিজে আমাকেই বলতেসেন। আর বার বার চোখ ভিজে আসতেসিলো। আর মনে মনে ঠিক করে নিলাম, যত যাই হোক জীবনে আর কখনোই আল্লাহ্ এর অবাধ্য হবো নাহ্। ইনশাআল্লাহ্।