মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

পরিত্যক্ত ডায়রি · অধ্যায় ২/৫

পার্ট - ০২

ঘুম ভাঙ্গলো মায়ের ডাকে,”কিরে! এই বেলায় কি ঘুমাচ্ছিস তুই! শরীর খারাপ করছে, নাকি?”

“নাহ্! তুমি এখান থেকে যাও। বলছিনা অযথা আমার রুমে আসবানা।” এই বলে, উঠে বসলো ইন্তিহা। মায়ের সাথে এমন ব্যবহার করে ওর খারাপ লাগাটা আরো বেড়েছে। আবার ডায়রি লেখা শুরু করলো। কে যেন ওকে বলেছিলো, মনের কথা ডায়রিতে লিখলে নাকি মন ভালো হয়ে যায়। সব ফালতু কথা! কোনো কিছুতেই এখন আর ওর মন ভালো হয় না। তবুও লেখা শুরু করলো।

“মায়েরা নাকি সবার মনের কথা বুঝে। আমার মা কেনো বুঝে না তাহলে! আমি তো আর টিনএজার না, যে সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে! সব কিছু একেবারে হাতে ধরে শিখাতে হবে! মা সারাদিন আমাকে বকে।

মাও আমাকে ভালোবাসে না।”

আবার যেন ঝড়ের মত কান্না পাচ্ছে ইন্তিহার। কিন্তু সে নিজেই বুঝতে পারছেনা ঠিক কি কারণে ওর কান্না পাচ্ছে। মা ঘুম থেকে তুলে দিলো, এই জন্য!

তপু ফোন ধরছে না, এই জন্য! নাকি কেউ ওকে ভালোবাসে না, এই জন্য! নিজেকে এখন সত্যিই পাগল মনে হচ্ছে ইন্তিহার। কিচ্ছু ভেবে পাচ্ছে না। পুরো মাথা ব্লাঙ্ক হয়ে আছে। অথচ সামনে মিড টার্ম পরীক্ষা। পড়াশোনার গোল্লাছাট অবস্থা।

ভাবলো একটু ফেসবুকে মেসেজ চেক করে দেখবে, তপু মেসেজ দিলো কিনা। নাহ্! দেয় নি। দিবেও না হয়ত আর! নিউজ ফিড ঘেটে কিছু গল্প পড়লো সে। সবই ভালোবাসার গল্প। আল্লাহ্ সবার জীবনেই ভালোবাসা দিয়েছে। শুধু তার তপুকেই কেড়ে নিলো। এসব ভাবতে ভাবতে স্ক্রোল ডাউন করছে। হঠৎ একটা সেনটেন্সে চোখ আটকে গেলো। লেখা,” আত্মহত্যা করবেন ভাবছেন! ” কৌতূহল নিয়ে পড়া শুরু করলো। দু এক লাইন পড়েই মেজাজ খারাপ করে ফোনটা খাটের উপর ছুড়ে ফেললো। রাগে গা জ্বলছে ইন্তিহার। কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে সে আবার ডায়রি লেখা শুরু করলো।

“তাহমিনা আপুর একটা পোস্ট দেখে ভাবলাম পড়ে ভালো লাগবে। দুই লাইন পড়েই দেখি, সেই কোরআন হাদীসের প্যাঁচাল। এই সব হুজুর টাইপ মানুষরা কি আর কিছু পায় না, নাকি! ফেসবুকেও কি কোরআন হাদীস ঢুকানো দরকার আছে। কাজিন, তাই আনফ্রেন্ডও করতে পারি না। মেসেজ নোটিফিকেশন অফ করে রাখসি। তা না হলে, দুদিন পরেই নতুন নতুন বইয়ের লিংক দিবে।নাহয় বলতে থাকে, ‘এই বই ভালো তুই পড়িস। পড়সিস তো।’ সবই কোরআন, হাদীস, ইসলাম রিলেটেড। কতবার বলসি এইসব পড়তে আমার ভালো লাগে না।তাও দিতেই থাকে। একবার তো বিরক্ত হয়ে ব্লক করেই দিসিলাম। ভাবসিলাম বুঝবে। নাহ্! পরে আম্মুর সামনে আমাকে জিজ্ঞাস করে, ’কিরে ইন্তিহা, তুই কি ব্লক করলি আমাকে!’ আর কি করা। আবার আনব্লক করে ফ্রেন্ড হওয়া লাগসে। ভাবসিলাম, এইবার অন্তত শিক্ষা হবে।কিন্তু নাহ্! উনি এখন আরো নতুন উদ্দমে, খুশি মনে, ফেসবুকে ইসলাম রিলেটেড পোস্টও দেয়া শুরু করসেন।কোনো লজ্জাও নাই মনে হয়! এভয়েড করতেসি, দেখতেসে বুঝতেসে তাও গায়ে পরে কথা বলতে আসে!

একটা সময় আমি আর তাহমিনা আপু বেস্ট ফ্রেন্ডের মত ছিলাম। একই ড্রেস পরতাম। জুতা, চুলের ক্লিপ থেকে শুরু করে সব একই কিনতাম। এমনকি একই ছেলেকে দেখে আমরা দুজন একই সাথে ক্রাশ খেতাম।একই সাথে একই গান শুনতাম। তখন তাহমিনা আপুরা আমাদের পাশের বাসায় থাকতো। হঠাৎ, ফুফার পোস্টিং রাজশাহী হলো। ওরা চলে গেলো।

প্রায় এক বছর আমাদের দেখা হয়নি। কিন্তু ফেসবুকে ডেইলি চ্যাট হত। তখন থেকেই ও আস্তে আস্তে চেঞ্জ হয়ে যায়। কথায় আছে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। ওর বেলায়ও একই অবস্থা হয়। এক বছর পর যখন আমাদের দেখা হয়, তখন তো আমি পুরাই হা! কাকে দেখলাম আমি এটা। আগা গোড়া পুরা কালো বোরখায় ঢাকা একটা মেয়ে! যার নখে অলওয়েজ নেইল পলিশ মাস্ট থাকতোই। তার এখন নখ বলতে গেলে দেখাই যায় না। কেটে এতোটাই ছোট করে রাখসে।

ও আসবে, তাই কত্ত এক্সাইটেড ছিলাম। কিন্তু ওকে দেখে আর কোনো কথা বলতেই ইচ্ছা হচ্ছিলো না। তখন থেকেই আমাদের দূরত্ব বাড়ে।

তপুর কথা বলসিলাম একবার ওকে। বলে, ’এসব করিস নাহ্! গুনাহ্ হয়।’ একজন মানুষকে ভালোবাসলেও গুনাহ্! এটা আবার কেমন কথা।

জানিনাহ্ কেনো যেন তাহমিনা আপুর সাথে কথা বলতে খুউব ইচ্ছা করতেসে। রাগ করে তো কল ব্লক করে রাখসি। আচ্ছে দেখি ফেসবুকে রিপ্লে দেয় কিনা। দিবে না মনে হয়।”

ফেসবুক ওপেন করে তাহমিনা আপুকে একটা মেসেজ দিলো ইন্তিহা। কি লিখবে তা ভেবে পাচ্ছিলোনা। তাই শুধু ” 🙂 ” দিয়ে সেন্ড করে দিলো। ৫ মিনিটের মধ্যে রিপ্লে।

“কিরে মন খারাপ, নাকি?” মেসেঞ্জারে, তাহমিনা আপু।

ইন্তিহা খুব অবাক হলো। আপু বুঝলো কি করে! যাক, তাও এতদিন পর হঠাৎ নক দিয়ে মন খারাপের কথা বলতে কেমন সংকোচ হচ্ছিলো ইন্তিহার। তাই স্বাভাবিকভাবেই বললো, ”নাহ্! কেমন আছো?”

তাহমিনাঃ আলহামদুলিল্লাহ্। ^_^ তুই?

ইন্তিহাঃ ভালোহ্।

আর কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না ইন্তিহা। আবার মনে মনে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। এই না আবার ইসলাম নিয়ে কথা শুরু করে দেয় আপু।

তাহমিনাঃ মামা মামি ভালো আছেন?

ইন্তিহাঃ সবাই ভালো আছে।

তাহমিনাঃ তোর পড়াশোনা কেমন চলতেসে?

ইন্তিহাঃ ভালহ্।

তাহমিনাঃ বাসায় থাকবি কালকে? ফ্রি ছিলাম। যাবো ভাবছিলাম তোদের বাসায়।

ইন্তিহাঃ আইসো।

তাহমিনাঃ তোর তপুর খবর কি?

ইন্তিহাঃ ভালোহ্।

তাহমিনাঃ সেদিন কবে যেনো দেখলাম কাকে নিয়ে বাইকে করে যাচ্ছে।

ইন্তিহাঃ আমাদের ব্রেকাপ হয়ে গেসে আপু। বাদ দাও ওর কথা।

তাহমিনাঃ মামির মাজার ব্যথা কমসে?

ইন্তিহা অফলাইন।