মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ৯/১৩

(০৯) ধর্ম সংক্রান্ত

ধর্ম সংক্রান্তঃ

আরজ আলী সাহেবের বই থেকে আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে, তিনি এমন-সব বিষয়কে ইসলামের সাথে ‘ইসলাম’ বলে জুড়ে দিয়েছেন, যা আদতে ইসলাম নয়। এটা এ জন্যই যে, ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল অতি সামান্য। বিকৃত কিছু ধর্মচর্চাকে তিনি ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন।

তার বইয়ের ‘ধর্ম বিষয়ক’ অধ্যায়ের শুরুতেই তিনি লিখেছেন,

“আল্লাহ মানুষকে পরিবর্তন না করিয়া হেদায়াতের ঝঞ্জাট পোহান কেন?”

অর্থাৎ উনার কথা হলো, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই যদি হয় আল্লাহর ইবাদাত করা, তাহলে সকল মানুষকে দিয়ে সেটা করিয়ে নিলেই তো পারে।

প্রথমত, আরজ আলী সাহেবকে বলতে চাই, আল্লাহর ইবাদাত করা মানুষ সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু ইবাদত শুধু কিছু রিচুয়াল বিষয়ের নাম নয়। “আল্লাহ যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন এমন-সব প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য কথা ও কাজ সবই ইবাদত। তবে করতে হবে পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও অমায়িক বিনয়ের মাধ্যমে”। [আল-উবুদিয়্যাহ]। সুতরাং মানুষকে দিয়ে দুনিয়ার যত কাজ তিনি করাবেন সবগুলোতেই কোনো কোনো ইবাদত করানো উদ্দেশ্য।

এই জিনিসটা আমরা সূরা বাকারার শুরুতেই দেখতে পাই যেখানে আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির প্রাক্কালে আল্লাহর সাথে ফেরেশতাদের কথোপকথন হয়। যেমন : কুরআন বলছে,

“আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, নিশ্চয়ই আমি যমীনে একজন খলীফা (মানুষ) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তখন তারা (ফেরেশতারা) বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন যারা ঝগড়া-ফ্যাসাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি (আল্লাহ) বললেন, নিশ্চই আমি যা জানি তা তোমরা জানো না”। [সূরা বাকারা (০২) : ৩০]

এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের সামনে ঘোষণা করলেন যে তিনি পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করবেন, তখন ফেরেশতারা বলল, আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা দুনিয়ায় ফ্যাসাদ করবে, ঝগড়া-বিবাদ করবে, রক্তপাত ঘটাবে? এর ঠিক পরেই তারা বলল, অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

অর্থাৎ ফেরেশতাদের কথা হচ্ছে, আপনি যদি কেবল আপনার রিচ্যুয়াল বা প্রকাশ্য তাসবীহ ও তাক্বদীসের জন্যই মানুষ সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে আমরা তো আছিই। এই দেখুন, আমরাই তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

ফেরেশতারা ধরেই নিয়েছে যে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করছেন কেবল উক্ত প্রকার ইবাদাতের জন্য। অথচ আল্লাহ তাদের এই ধারণা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না’। যার অর্থ : আমার ইবাদত হবে তাদের মাধ্যমে। কারণ, তারা চিন্তা-চেতনা, মনন, ইচ্ছার মাধ্যমে আমার ইবাদত করবে তোমাদের মতো এক প্রকার ইবাদতে তারা ব্যস্ত থাকবে না।

আরজ আলীও ধারণা করে বসলেন যে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কেবলই আল্লাহর রিচ্যুয়াল ইবাদাত করা। অথচ মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কেবল এই এক ধরণের ইবাদত নয়। তিনি ফেরেশতাদের চেয়েও ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন ফর্মুলায়, ভিন্ন মেকানিজমে মানুষকে তৈরি করেছেন। মানুষকে দিয়েছেন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। এই ইচছাশক্তি ফেরেশতাদের কাছেও নেই। মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি তাদের সামনে হেদায়াতের পথ এবং গুমরাহীর পথ, দুটোই উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এবং হেদায়াতের পথ ও গুমরাহীর পথ সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য তিনি অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এখন মানুষ তাদের নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে হয় হেদায়াতের পথ বেছে নিয়েছে, নয়তো গুমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছে। এটাও মানুষ সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কেবল আল্লাহর ইবাদাত করা নয়।

দ্বিতীয়ত বলতে চাই, ইসলাম বলে, মানুষকে দুনিয়াতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, কে আল্লাহর কথা শুনে চলে আর কে শোনে না তা পরিষ্কার করে দিতে চান। এ পরীক্ষার দাবিই হচ্ছে তিনি কিতাব দেবেন, রাসূল পাঠাবেন, বিবেক দেবেন এবং এগুলোকে যে কাজে লাগায় তার জন্য পুরস্কার দেবেন আর যে কাজে লাগায় না সে পুরস্কার পাবে না।

বস্তুত আরজ আলী সাহেবের কথা হচ্ছে আবদারী কথা। জানি না তিনি জীবনে কোনো পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়েছেন কি না? যদি নিয়ে থাকেন তো মস্ত বড় অন্যায় করেছেন, তার দরকার ছিল তার শিক্ষকের কাছে গিয়ে পিস্তল ধরে বলা আমাকে পরীক্ষা কেন দিতে হবে? আপনি আমাকে পাশ-ফেল একটা দিয়ে দেন না! অথবা তিনি জীবনে চাকরিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন কি না? তার তো উচিত সবার জন্য বিনা পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, প্রচেষ্টা ছাড়াই চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া। কী বলেন, তিনি তা করবেন? নাকি কোনো বিবেকবান মানুষ তা করবে?

‘ভাগ্যলিপি কি অপরিবর্তনীয়?’ শিরোনামে আরজ আলী সাহেব আবারও তাক্বদীর সম্পর্কে না জেনে উদ্ভট প্রশ্ন করে গেছেন। তিনি লিখেছেন,

“মনে করা যাক, কোন এক ব্যক্তির ভাগ্যলিপিতে লেখা আছে যে সে নারকী। এখন সে নির্ধারিত ওই ফলোৎপাদক কার্য, যথা- চুরি, ডাকাতি, নরহত্যা ইত্যাদি করিবে না কি? যদি করে, তাহা সে কাহার ইচ্ছায় করে?”

আগের অধ্যায়ে আমি তাক্বদীর সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছি। আমি পরিষ্কার ব্যাখ্যা করেছি যে, তাক্বদীর পূর্বলিখিত এর মানে এটা নয় যে, মানুষ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন রোবট। আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন মানুষ তা-ই করছে। এটা হলে মানুষ আর জাগতিক অন্য বিবেকহীন বস্তুর মধ্যে তাহলে পার্থক্য কী?

আসল কথা হলো, আল্লাহ হলেন ‘আলিমুল গায়েব’। উনি ভবিষ্যদ্রষ্টা। উনি জানেন ভবিষ্যতে কে কী করবে, কী বলবে। তিনি সময় দ্বারা আবদ্ধ নন। তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে। তিনি মানুষের অবস্থা জানেন বলেই সেগুলো লিখে রেখেছেন।

ধরুন, আমি যদি বলি, আজ থেকে ২০০ বছর পরে মুসলিমরা বিশ্ব শাসন করবে। এখন ২০০ বছর পরে গিয়ে যদি ঠিক ঠিক বিশ্ব মুসলিম-শাসনে চলে আসে, তাহলে তার মানে কি এটাই দাঁড়াবে যে, আমি বলেছি বলেই বিশ্ব মুসলিম-শাসনে চলে এসেছে? নাহ। বিশ্ব যদি মুসলিম-শাসনে আসে তাহলে তাদের চেষ্টা, তাদের তদবির, ঐকান্তিকতা দিয়েই আসবে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। আমি জাস্ট অনুমান করেছি।

আমি মানুষ। আমি জানি না এক মিনিট পরে পৃথিবীতে কী হবে। আমি ভবিষ্যৎ বলতে পারি না। এ জন্যই আমাকে অনুমান করতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা হলেন ‘আলিমুল গায়েব’ তথা ভবিষ্যদ্রষ্টা। তিনি সৃষ্টির শুরুতে বসেই দেখতে পান সৃষ্টির শেষে কী হতে পারে। সময় তাকে বন্দী করতে পারে না; বরং তিনিই সময়কে বন্দী করেন। আমাকে সৃষ্টি করার শুরুতেই তিনি জানেন আজ সোমবারে বসে আমি আমার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে ঠিক কোন কোন কাজ করব। তিনি জানেন বলেই লিখে রেখেছেন সেসব অগ্রিম। তার মানে কি এই যে, তিনি লিখে রেখেছেন বলেই আমরা এসব করছি? না; বরং এর মানে এটাই যে, আমরা এসব করব বলেই তিনি লিখে রেখেছেন। তাহলে কেউ চুরি, ডাকাতি, নরহত্যা করলে কার দোষ? স্রষ্টার? একদম না। এটা ব্যক্তিরই দোষ। স্রষ্টার নয়।

‘আদমের পাপ কী?’ শিরোনামে তিনি প্রশ্ন করেছেন,

“আদমকে বেহেস্তে রাখিয়া তাহাকে গন্দম খাইতে যে নিষেধ করা হইয়াছিলো, সে নিষেধ কি খোদা তাআলার আন্তরিকতাপূর্ণ ছিলো? আদম গন্দম খাইয়া প্রকারান্তরে আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ণ করিলেন। যে কাজ ভাগ্যলিপির অনুকূল এবং আল্লাহর ইচ্ছাকে পূর্ণ করে, তাহাতে পাপ কী?”

এই প্রশ্নের উত্তর একটু আগেই দেওয়া হয়েছে। আমরা স্পষ্ট করেছি যে, তাকদীর তথা ভাগ্যলিপিতে লিপিবদ্ধ থাকা মানেই তা আল্লাহর ইচ্ছা নয়! আদম আলাইহিস সালাম গন্দম ফল খেয়ে ভুল করেছিলেন। এই কাজ তিনি তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করেই সম্পন্ন করেছেন। আল্লাহ তাআলা যেহেতু তাকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন সেহেতু তিনি তাকে সেটা করতে বাধা দেননি। কারণ, বাধা দিলে পরীক্ষার প্রশ্নই আসতো না। সুতরাং মানুষ ও জ্বীনজাতি যেহেতু বিবেকবান ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তা, শুধু তাদেরকেই তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যেভাবে আমাদের পাপকাজ না করার জন্য গাইডলাইন দেন, সে রকম আদম আলাইহিস সালামকেও নিষেধ করেছিলেন কেবল। আদম আলাইহিস সালাম তা পালনে ব্যর্থ হলেন বলে তিনি বেহেশত থেকে বিচ্যুত হন। ব্যস! মূলত তাক্বদীর সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে মানুষ এ ধরনের প্রশ্নগুলো করে থাকে। আরজ আলীও ঠিক তা-ই করেছেন।

‘শয়তান কী’ শিরোনামে আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“ধর্মধ্যায়ীগণ বলিয়া থাকেন যে, শয়তান পূর্বে ছিল ‘মকরম’ বা ‘ইবলিশ’ নামক বেহেস্তবাসী একজন প্রথম শ্রেণীর ফেরেশতা এবং অতিরিক্ত মুসল্লি”।

আরজ আলী সাহেব এখানে জঘন্য একটি মিথ্যাচার করেছেন। সেটি হলো, ইবলিশ কখনোই ফেরেশতা ছিল না। সে ছিল একজন জ্বীন। পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে সুস্পষ্ট বলা আছে যে, ইবলিশ একজন জ্বীন। যেমন : আল্লাহ তাআলা বলছেন,

“স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন, আদমকে সিজদাহ করো, তখন তাদের সকলে আদমকে সিজদাহ করল শুধু ইবলিশ ছাড়া। সে ছিল জ্বীনদের অন্তর্ভুক্ত”।[সূরা আল কাহাফের ৫০ নম্বর আয়াতে]

এখানে স্পষ্ট বলা হচ্ছে, ইবলিশ ছিল জ্বীনদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা আরেক জায়গার কথোপকথন খেয়াল করি।

আল্লাহ তাআলা যখন ফেরেশতাদের হুকুম করলেন আদম আলাইহিস সালামকে সিজদাহ করার জন্য, তখন সবাই সিজদাহ করলেও ইবলিশ করেনি। সে গর্বভরে বলেছিল,

“আমি তাঁর (আদমের) চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে”।[সূরা আল আ’রাফ (০৭):১২]

এখানে স্পষ্ট যে, ইবলিশ তার গাঠনিক উপাদান জানিয়ে বলছে আল্লাহ তাকে তৈরি করেছেন আগুন থেকে। যদি সে ফেরেশতা হতো, তাহলে নিশ্চয়ই সে তার গাঠনিক উপাদান হিসেবে আগুনের বদলে ‘নূর’ তথা আলোর কথাই বলত। কারণ, একথা আমরা সকলে জানি যে, ফেরেশতারা নূরের তৈরি। কিন্তু ইবলিশ নিজেকে নূরের তৈরি দাবি না করে আগুনের তৈরি দাবি করেছে। এখন কারা আগুন থেকে তৈরি? কুরআন বলছে,

“এবং জ্বীনজাতিকে আমি আগুনের লেলিহান শিখা থেকে সৃষ্টি করেছি”।[সূরা আল হিজর (১৫): ২৭]

তাহলে কুরআনের কোথাও দাবি করা হয়নি যে ইবলিশ ফেরেশতা ছিল; বরং ইবলিশ নিজেই বলেছে সে আগুনের তৈরি। আর একমাত্র আগুন থেকে সৃষ্ট হলে জ্বীনেরাই। সুতরাং একথা তাহলে স্পষ্ট যে, ইবলিশ ফেরেশতা নয়, জ্বীন ছিল।

প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে আল্লাহ তো সেদিন ফেরেশতাদেরই নির্দেশ দিয়েছিলেন আদম আলাইহিস সালামকে সিজদাহ করার জন্য। জ্বীনদের তো দেননি। তাহলে জ্বীন হয়ে ইবলিশ কেন সিজদাহ করতে যাবে?

মূলত, আরবী ব্যাকরণে একটি নিয়ম আছে। এই নিয়মটিকে বলা হয় Tagleeb । এটার অর্থ : যখন ম্যাজরিটিকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হবে, তখন সেখানে মাইনোরিটিও ইনক্লুড হয়ে যাবে। যেমন : কোন ক্লাসে যদি দশ জন ছেলে এবং এক জন মেয়ে থাকে, তাহলে ক্লাসটিচার যদি ম্যাজিরিটি দশ জনকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেন, তাহলে মাইনোরিটি একজনও সেখানে ইনক্লুড় হয়ে যাবে।

ঠিক সেভাবেই, সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ ফেরেশতাদের ভিড়ে সংখ্যালঘু ছিল ইবলিশ। ফেরেশতাদের জন্য দেওয়া নির্দেশ সমানভাবে তার ওপরও বর্তায়। এতে করে কোনোভাবেই এটা বোঝায় না যে, ইবলিশ ফেরেশতা ছিল। কুরআনুল কারীমে স্পষ্ট ইবলিশকে জ্বীন বলে উল্লেখ করা সত্ত্বেও আরজ আলী সাহেবেরা কীভাবে তাকে ফেরেশতা বলে চালিয়ে দেয়? এটা কি নিছক ইসলাম আর কুরআন নিয়ে অজ্ঞতার ফল, নাকি অন্য কিছু?

এরপর ফেরেশতাদের সাথে গুলিয়ে আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“ফেরেশতাদের যেহেতু লিঙ্গভেদ থাকে না, তাহলে ইবলিশ কীভাবে বংশবৃদ্ধি করে? বংশবৃদ্ধি করতে হলে তো তার ক্লীবত্ব ত্যাগ করে তাকে পুংলিঙ্গের অধিকারী হতে হবে এবং তার একজন স্ত্রী-শয়তানেরও দরকার বংশবৃদ্ধি করার জন্য”।

যেহেতু ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, ইবলিশ ফেরেশতা নয়, জ্বীন ছিল, সেহেতু জ্বীনদের যে বংশবৃদ্ধি হয়, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা থাকতে পারে, তা প্রমাণিত। সেহেতু আরজ আলী সাহেবের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা অনুযায়ী ইবলিশকে নতুন করে তার ক্লীবত্ব ত্যাগ করে পুংলিঙ্গ গ্রহণ করতে হচ্ছে না।

শয়তান আছে কি নেই আরজ আলী সাহেব তার প্রমাণ চেয়েছেন। আরজ আলী সাহেবদের একটি মারাত্মক সমস্যা এই যে, উনারা সবকিছুতে বিজ্ঞানের বাটখারা বসিয়ে তাকে মাপতে চান। অথচ তারা চিন্তাও করে না যে, তাদের বিজ্ঞানের কত কত সীমাবদ্ধতা আছে।

ইবলিশ জ্বীন ছিল। জ্বীনেরা আগুনের তৈরি। তারা ভিন্ন জগতের, ভিন্নমাত্রার কোনো সৃষ্টি কি হতে পারে না? অবশ্যই পারে। আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টির প্রাক্কালে ফেরেশতাদের সাথে সেদিনের সেই মজলিশে ইবলিশের উপস্থিতিই প্রমাণ করে, তারা ভিন্ন একটি জগতের, ভিন্ন একটি মাত্রার।

তবে তারা আমাদের আশেপাশেই বিচরণ করে। আমরা তাদের দেখি না, তারা আমাদের দেখে।[সূরা আল-আরাফ (০৭) : ২৭]

আরজ আলী সাহেবদের বিজ্ঞান হন্যে হয়ে গ্রহ থেকে গ্রহ চষে বেড়াচ্ছে এলিয়েনের খোঁজে। ভিন্ন জগতের ভিন্ন মাত্রার ভিন্ন সৃষ্টি এই এলিয়েনের ওপর ঈমান আনা যায়, কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় যখন ইসলাম জ্বীনের কথা বলে। সেলুকাস!

আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন,

“সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা আল্লাহর উপাসনা বা ইবাদাতের সময় নির্দিষ্ট কেন বা এসবের জন্য নির্দিষ্ট দিক নির্ণয় কেন?”

আরজ আলী সাহেবরা তাঁদের নিজস্ব চিন্তাধারা নিয়ে এতই বিভোর, এতই আত্মনিমগ্ন থাকেন যে একটা নির্দিষ্ট জিনিসের, সেটা ধর্ম হোক আর যা-ই হোক, কিছু রুলস এন্ড রেগুলেশন্স থাকে বা থাকতে হয়, সেটা তাঁরা বেমালুম ভুলে বসে আছেন।

সেক্যুলার পৃথিবীর দিকে তাকালেই তো সেটা আমরা বুঝতে পারি। একটা স্কুলে নির্দিষ্ট একটা সময়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ানো হয়। একটা দেশের প্রতিটা সামরিক বাহিনীতেই সব কাজই নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক করা হয়। এগুলো হলো ‘রুলস এন্ড রেগুলেশনস’।

একটি স্কুলের কথা চিন্তা করা যাক। ধরুন আপনার বাচ্চা ক্লাস টু-তে পড়ে। আপনি তার স্কুল হতে দেওয়া প্রসপেক্টাস কিংবা সিলেবাস খুললেই দেখবেন সেখানে লেখা থাকে, সপ্তাহের অমুক দিন থেকে অমুক দিন স্কুল এতটা থেকে এতটা পর্যন্ত খোলা থাকে। অমুক অমুক দিন স্কুল বন্ধ থাকে। আপনি যখন আপনার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠান, আপনি কিন্তু সেই সময় অনুযায়ী স্কুলে পাঠান যে সময়টা স্কুল কর্তৃপক্ষ আপনাকে নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের পরে স্কুলে আসলে আপনার বাচ্চাকে ক্লাসে এলাউ করা হয় না। কিংবা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে যদি আপনার সন্তান স্কুলে এসে হাজির হয়, তার জন্য টিচাররা ক্লাস শুরু করে দেয় না। প্রত্যেকটা জিনিস সিস্টেম্যাটিক।

ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। কুরআন এবং হাদীস হচ্ছে এই জীবনবিধানের একটি ম্যানুয়াল। সুতরাং এই জীবনবিধানের রিচ্যুয়ালের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকবে না, সিস্টেম্যাটিক হবে না, তা কী করে হয়? আর মুসলিম শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘আত্মসমর্পণকারী’। একজন মুসলিম তার রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলে। তার কোনো ইচ্ছা যদি তার রবের বিধানের বিপরীতে যায়, সে তার ইচ্ছার বদলে তার রবের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়। এটাতেই সে কল্যাণ খুঁজে পায়। তাই মহান রাব্বুল আলামীন আদেশ করেছেন আমরা যেন পবিত্র কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করি। এটা আল্লাহর আদেশ। এখন, এই আদেশ দিয়ে তিনি দেখতে চান যে কারা এই আদেশ অনুসরণ করে।

আরজ আলী সাহেবদের মতো অনেকেই বলে, কাবা তাওয়াফ করে, কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে মুসলিমরা নাকি মূলত কাবার পূজা করে! এটা যে কত বড় মিথ্যাচার, তাদের ভুল ধারণা তা একটি হাদীস থেকেই আমরা বুঝতে পারি। সেটি হলো, কাবা শরীফে থাকা হাজরে আসওয়াদে চুমু খেয়ে একবার ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! তুমি তো কেবল একটি পাথর ছাড়া আর কিছুই নও। আমি তোমাকে কোনো দিনও চুমু খেতাম না যদি না আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতাম তোমাকে চুমু খেতে’।

এই হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি, হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া একটা সুন্নাতের অনুসরণমাত্র। এবং এই জিনিসটা একটা পাথর। এটার কোনো বিশেষত্ব নেই। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাতে চুমু খেয়েছিলেন বলেই ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুও চুমু খেয়েছিলেন। এটা আনুগত্যের একটা অংশ, আর কিছু না। তা ছাড়া, ইসলাম যদি নির্দেশ দিত যে, যার যেদিকে ফিরে নামাজ পড়তে মন চায়, সে সেদিকে ফিরে নামাজ পড়তে পারে, তাহলে বিরাট এক সমস্যার জন্ম নিত। কী রকম সেটা?

ধরুন, একই কাতারে আপনি পশ্চিমমুখী, আমি উত্তরমুখী। আমার পাশের জন দক্ষিণমুখী এবং এর পরের জন পূর্বমুখী। জিনিসটা কেমন দেখায়? বিদঘুটে না? নির্দিষ্ট দিকে কিবলা নির্ধারণ করে দেওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে।

একই পৃষ্ঠায় আরজ আলী সাহেব ‘ফেরেশতাদের কাজ কী’ শিরোনামে প্রশ্ন করেছেন।

ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে কার্য সম্পাদন করান, এর অর্থ এটা নয় যে তিনি এই কাজগুলো করতে অক্ষম। বরং তিনি তার অনুগত একটি সৃষ্টিকে দিয়ে কাজগুলো করান। এটা আল্লাহর ক্ষমতাকে আরও বিশালরূপে প্রকাশ করে।

‘দুরত্বহীন যাতায়াত কি সম্ভব?’ শিরোনামে আরজ আলী সাহেব লিখেছেন, “শোনা যায় জিব্রাঈল আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে আসতেন এবং ওহী দিয়ে চলে যেতেন”।

এতটুকু বলে তিনি একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে বসেছেন। বলেছেন, “আল্লাহ নিশ্চয়ই নবীদের হতে দূরে ছিলেন না। যদি দূরেই না থাকেন, তাহলে জিব্রাঈল কোথেকে আসতেন আর কোথায় ফিরে যেতেন?”

আরজ আলী সাহেবদের ধর্মের ব্যাপারে, বিশেষ করে ইসলামধর্মের ব্যাপারে অজ্ঞতাই মূলত এ রকম প্রশ্ন উত্থাপনের মূল কারণ। আমরা আগের অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করেছি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর আরশে রয়েছেন।

তিনি আরশ থেকেই ফেরেশতা জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে নবীদের কাছে ওহী পাঠাতেন। আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলা হচ্ছেন এই সমগ্র সৃষ্টিজগতের মালিক। একচ্ছত্র অধিপতি। রাজাধিরাজ।

আমরা সামান্য একটি গরিব দেশের প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতির কথা চিন্তা করি। তারা যখন কারও কাছে কোনো বার্তা পাঠান, তখন কি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি নিজে এসে তা ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়ে যান? না। না, তারা সেটা তাদের পারসোনাল সেক্রেটারি বা অন্য কারও মাধ্যমে ব্যক্তি বরাবর পৌঁছান।

এতে করে কি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির সম্মান ক্ষুন্ন হয় না বৃদ্ধি পায়? এই যদি হয় একজন অতি সামান্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মানের নমুনার স্বাক্ষর, তাহলে যিন বিশ্বজাহানের রব, যিনি এই সমস্ত সৃষ্টিকুলের সৃষ্টিকর্তা, তিনি কি তার বান্দার কাছে কোনো বাণী পাঠাতে হলে আসমান থেকে নেমে আসবেন? প্রশ্নটাই কি হাস্যকর না?

এরপরে তিনি প্রশ্ন করেছেন মিরাজ সত্য না স্বপ্ন?

প্রশ্নের শুরুতেই তিনি বলেছেন,

“কথিত হয় যে, মেরাজ গমনে (সাঃ) এর বাহন ছিলো প্রথম পর্বে ‘বোরাক’ ও দ্বিতীয় পর্বে ‘রফরফ’। উহারা এরূপ দুইটি জানোয়ার, যাহার দ্বিতীয়টি জগতে নাই। বোরাক- পশু, পাখি ও মানব এই তিন জাতির প্রাণীর মিশ্ররূপের জানোয়ার। অর্থাৎ তাহার ঘোড়র দেহ, পাখির মতো পাখা, এবং রমণীসদৃশ মুখমণ্ডল”।

আরজ আলী সাহেব বোরাকের এ রকম অদ্ভুত বর্ণনা কোথায় পেয়েছেন তা তিনি উল্লেখ করেননি। হাদীস শরীফে বোরাকের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা হলো, এটা আকৃতিতে খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড়। কিন্তু আরজ আলী সাহেব এই বাহনের গায়ে পাখির মতো ডানা এবং রমণীর মুখ কোথায় পেলেন তা আমরা জানি না।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন, আলোর চেয়ে বেশি গতিশীল কোনো কিছু জগতে নেই। তিনি আরও বলেছেন, বিজ্ঞানীগণ মহাশূন্য চষে বেড়িয়েও কোথাও বেহেশত, দোযখ, আরশের খোঁজ পায় নাই। যেহেতু বিজ্ঞানীরা তাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বে এসবের কোনো অস্তিত্ব পায় নাই, তাহলে এগুলো কোথায়? এগুলো কি আদৌ আছে? থাকলেও হয়তো-বা মহাবিশ্বের বহির্ভাগে আছে। কিন্তু কথা হলো, সামান্য জন্তুর পিঠে চড়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে এই কোটি কোটি মাইল দূরত্বের আরশভ্রমণে গেলেন?

ইসলাম নিয়ে যার ন্যূনতম পড়াশুনা আছে, সে রকম ব্যক্তিমাত্রই আরজ আলী সাহেবের এই শিশুসুলভ প্রশ্ন শুনে হেসে উঠবে। আরজ আলী সাহেবদের সমস্যা হলো, তারা তাদের বস্তুবাদী চোখ দিয়ে দ্বীন ইসলামকে যাচাই করে। ফলে তারা মনে করে, তারা যা কিছু দেখতে পায় কেবল জগতে সেসবই অস্তিত্বশীল। যা তারা চোখে দেখে না, তার কোনো কিছুরই জগতে অস্তিত্ব নেই।

বস্তুবাদ তথা আরজ আলী সাহেবদের এই পুরোনো ধ্যান-ধারণা থেকে বিজ্ঞান নিজেই এখন ইউটার্ন দিয়ে সরে এসেছে। বিজ্ঞান এখন খুব জোরেশোরেই বিশ্বাস করে যে, তাদের জানার আর বোঝার জগৎ এতটাই ক্ষুদ্র যে, বিশাল মহাবিশ্বের সাথে তুলনা করলে বলতে হয়, তারা আসলে মহাবিশ্ব সম্পর্কে কিছুই জানে না।

অনেক বিজ্ঞানী এখন বিশ্বাস করে যে, আমরা মূলত Computer Matrix একটা বিশ্বে আছি। আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কোনো গ্রহের অন্য কোনো বুদ্ধিমান সত্তা যে আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমান। কেউ কেউ মনে করে, আমরা মূলত ভবিষ্যতেই আছি। আবার কেউ কেউ দাবি করে, আমরা সবাই একটা ঘোরের মধ্যে আছি। ঘোর কাটলে দেখা যাবে, এসবের কোনো কিছুই আদতে অস্তিত্বশীল নয়।

যাহোক, এসব হলো বিভিন্ন থিওরি, মত ইত্যাদি। বিজ্ঞান বিজ্ঞানের মতো করেই আগাচ্ছে। বিজ্ঞান এমন এক জিনিস, যার ওপর নির্ভর করে কখনোই কোনো ফাইনাল ডিসিশান নেওয়া যায় না। বিজ্ঞান সর্বদাই পরিবর্তনশীল।

আরজ আলী সাহেবদের সমস্যা হলো, তারা বিজ্ঞানের সাথে ধর্মকে গুলিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। তারা ধরে নিয়েছেন, বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মের পোস্টমর্টেম করে ধর্মকে বাতিল করে দেওয়া সম্ভব। আদতে, বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুইটা দুই বিষয়।



ধর্ম কখনোই বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় নয়। আবার বিজ্ঞান কখনোই ধর্মের মাথাব্যথাও নয়। কিন্তু বাই ন্যাচার, এই দুটো পরস্পরের প্রতিযোগীও নয়। এ জন্যই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, “ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান অন্ধ এবং বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম পঙ্গু”।

আরজ আলী সাহেব ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকে চড়েই মনে হয় সাত আসমান ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু আদতে তা নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকে চড়ে কেবল বায়তুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আর বায়তুল হারাম এবং বায়তুল মুকাদ্দাস দুটোই এই পৃথিবীতে। পৃথিবীর বাইরে নয়। সুতরাং বোরাকে চড়ে সাত আসমান ভ্রমণটা নিশ্চিতরূপে বানোয়াট, মিথ্যা এবং অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। তা ছাড়া, বোরাকের একটা আকৃতি হাদীস শরীফে পাওয়া যায়। এটা আকৃতিতে খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড়।

এই বর্ণনা থেকে আরজ আলী সাহেবেরা ধরে নিয়েছেন যে, এটা মনে হয় কোনো প্রাণীসদৃশ যেটা নিশ্বাস নেয়, ঘাস খায়, মল ত্যাগ করে ইত্যাদি। কিন্তু হাদীসের কোনো রেওয়ায়েতে এ রকম কিছুই পাওয়া যায় না। ব্যাপারটাকে বোঝার জন্য চলুন আমরা একটা কাল্পনিক ঘটনার অবতারণা করি।

ধরুন, আপনার মাকে আপনি বিমানযোগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। আরও ধরুন, আজকের আগে আপনার মা কোনো দিনও বিমান চোখে দেখেননি। এখন আপনার মা যখন ঢাকায় এসে উনার প্রতিবেশীদের সাথে বিমানভ্রমণের গল্প করবেন, তখন নিশ্চয়ই প্রতিবেশীরা উনার কাছে বিমান সম্পর্কে জানতে চাইবে। এখন প্রতিবেশীরা ইতিপূর্বে কোনো দিন বিমান স্বচক্ষে না দেখার কারণে আপনার মা যদি বলেন, ‘বিমানটা হচ্ছে দেখতে পাখির মতো। এটা হাতির চেয়ে ছোট কিন্তু গরুর চেয়ে বড়’।

বলুন তো, আপনার মায়ের বর্ণনায় কি কোনো ভুল আছে? আমাদের দেখা বিমানগুলো কিন্তু পাখির আকৃতিতেই তৈরি। এগুলোর ডানাও আছে। এখন আপনার মা কেন হাতি আর গরুর উপমা টেনে বিমানের আকৃতি বোঝালেন? কারণ হচ্ছে, এর আগে আপনার মায়ের প্রতিবেশীরা বিশালকার জন্তু বলতে গরু আর হাতিকেই দেখেছে। এর বাইরে আর কিছু দেখেনি। যখন দেখেছে বিমানের আকৃতিটাও অনেকটাই জন্তুর মতো, তাই উপমাপ্রদানের ক্ষেত্রেও হাতি আর গরুর কথাই তিনি বর্ণনা করেছেন তাদের বোঝাবার স্বার্থে। এখন বিমানের আকৃতি বোঝাতে আপনার মা যেহেতু গরু আর হাতির উপমা দিয়েছেন, এর মানে কি এটাই বুঝায় যে বিমান গরু আর হাতির মতো কোনো জন্তু? গরু আর হাতির মতো বিমানও খায়? নিশ্বাস নেয়? মল ত্যাগ করে?

আপনার মায়ের বক্তব্য নিশ্চয় এটা বোঝায় না। ঠিক সেভাবে, বোরাক সম্পর্কে দেওয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্তব্যও এটা বোঝায় না যে বোরাক পৃথিবীর কোনো জন্তু। বোরাকের যে আকৃতি ছিল, সে রকম আকৃতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের লোকেরা কেবল গাধা আর খচ্চর দেখে অভ্যস্ত বলেই উনি এ দুটোর উপমা টেনেছেন।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“হাজার হাজার বছরের পুরাতন স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন পৃথিবীতে অনেক আছে। খৃঃ পূঃ তিন হাজার বছরেরও অধিককাল পূর্বে নির্মিত মিশরের পিরামিডসমূহ আজও অক্ষত দাঁড়াইয়া আছে। হজরতের মেরাজ গমন খুব বেশিদিনের কথা নয়। মাত্র খ্রিষ্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকের ঘটনা। ঘটনাটি বাস্তব হইলে- যে সকল দৃশ্য তিনি মহাশূন্যে স্বচক্ষে দেখিয়া ছিলেন (আরশ-বেহেশত-দোযখ), তাহা আজও সেখানে বর্তমান থাকা উচিত। কিন্তু আছে কি? থাকিলে তাহা আকাশ বিজ্ঞানীদের দূরবীনে ধরা পড়ে না কেন?”

হাস্যকর দাবি! বার বার তিনি হাবলের টেলিস্কোপে জান্নাত-জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করার কথা বলেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিরাজ ছিল এক মিরাকল। এটি কেবল উনার জন্যই। জান্নাত-জাহান্নাম পৃথিবীতে বসে প্রত্যক্ষ করার মতো কোনো স্থান বা বস্তু নয়। এটা পারলৌকিক বিষয়। এই অদেখা, অদৃশ্য বিষয়ের ওপর বিশ্বাসের নাম ঈমান।

আবার ধরে নিলাম মহাশূন্যের কোনো এক জায়গায় জান্নাত-জাহান্নাম অবস্থিত। ফাইন। কিন্তু আরজ আলী সাহেবদের আকাশবিজ্ঞানীদের দুরবিন কি সেখানে পৌঁছাতে পারবে? এসব আকাশবিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের কতটুকুই জানতে পেরেছে বা রপ্ত করতে পেরেছে?

আগেই আলোচনা করেছি, বিজ্ঞানী সংস্থা নাসার হিসাবে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের মাত্র ৫% এর মতো জানতে পেরেছে বা বুঝতে পেরেছে। আর বাকি ৯৫% সম্পর্কে বিজ্ঞান কিছুই জানে না। তো এই হচ্ছে আরজ আলী সাহেবদের বিজ্ঞানের দৌড়। তথাকথিত বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে বসে সে মাত্র ৫% জ্ঞান আমাদের জানাতে পারছে। হায়! আরজ আলী সাহেবদের মতো বিজ্ঞানপূজারিদের জন্য আমাদের মায়া হয়।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে বা আলোর সমপর্যায়ের গতিতে কোনো কিছুই যেতে পারে না। তাহলে বোরাক নামের একটা জানোয়ারের পিঠে চড়ে মুহাম্মাদ কীভাবে আকাশভ্রমণ করলেন? আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। তাহলে বোরাকের গতি কী রকম?”

মজার প্রশ্ন বটে! প্রথমত, বোরাক গরু, গাধার সদৃশ কোনো জন্তু ছিল না সেটা আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। বোরাক ছিল একটা বিশেষ বাহন। আরজ আলী সাহেব যা জানত না তা হলো, বোরাক শব্দটি এসেছে ‘বারক্বুন’ থেকে। বারক্বুন অর্থ : বিজলি। বিজলি অর্থ আলো। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। সুতরাং আলটিমেইটলি বোরাকের গতিও প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। তাই হতে পারে বোরাক দ্বারা আলোর গতি বুঝিয়েছেন। আবার হতে পারে তা অন্য কোনো আলো যা আরও অধিক গতিসম্পন্ন। হায়! আরজ আলী সাহেবেরা যদি জানত!

তিনি বলেছেন,

“পরিমাপযোগ্য সবকিছুর ইউনিট থাকে। অর্থাৎ পরিমাপের একক। তাহলে নেকীর যে বিভিন্ন পরিমাপের কথা উল্লেখ আছে, নেকী পরিমাপের একক কী?”

আচ্ছা, যদি আমি প্রশ্ন করি, ‘তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো?’

বলুন তো, ভালোবাসা কি দেখা যায়? ধরা যায়? ভালোবাসা পরিমাপ করা যায়? ভালোবাসা পরিমাপের একক কী? যদি না যায়, তাহলে ভালোবাসা পরিমাপের কথা কোত্থেকে আসে?

তাহলে বোঝা গেল, সব জিনিস পরিমাপের একক বোঝানো যায় না, বাটখারা নির্ধারণ করা যায় না। যদিও সেটার একটি পরিমাণ অবশ্যই রয়েছে। সেটা অবস্থা ও বস্তু অনুসারে নির্ধারিত হয়।

আবার তিনি বলেছেন,

“পাপের কি ওজন আছে? যদি না থাকে, তাহলে পরকালে পাপের পরিমাপ করে শাস্তি-পুরস্কারের বিধান কেন?”

মজার প্রশ্ন! পাপের ওজন নেই। হিসাব আছে। আর এই হিসাব সংরক্ষণ করা হয় ব্যক্তির আমলনামায়। একটি মিথ্যা কথা একটি পাপ। একটি খুন একটি পাপ… এভাবে ব্যক্তির কৃতকার্য থেকেই পরিমাপ করা হয় সে কত পাপ করেছে বা পুণ্য করেছে।

এরপরে আরজ আলী সাহেব হিন্দুধর্ম তথা পৌত্তলিকতার কিছু আচার টেনে তার সাথে ইসলামিক রিচ্যুয়ালের সামঞ্জস্য বের করে প্রশ্ন করেছেন-

“ইসলাম সংস্কারবাদী ধর্ম হলে তার সাথে পৌত্তলিকতার সাদৃশ্য কেন?”

আচ্ছা, খ্রিষ্টানরাও বিশেষ দিনে রোজা (Fast) রাখে। গির্জায় যায়। প্রার্থনা করে। মুনাজাত করে। তারাও এক আদি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে। এখন আপনি যদি এর সাথে ইসলামের একত্ববাদ, সিয়াম, মসজিদে যাওয়া, দোয়া করা ইত্যাদিকে গুলিয়ে খ্রিষ্টানিটির সাথে ইসলামের সাদৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কেমন দেখায়?

উনি বলেছেন,

“শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়লে পরবর্তী এক বছরের রুটি-রোজগারে বরকত আসে”।

কত বড় ডাহা মিথ্যা কথা। শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত কোথাও একথা বলা নেই যে, এই রাতে নামাজ পড়লে আগামী এক বছরের রুটি-রোজগারের পথ সুপ্রসন্ন হয়। আরজ আলী সাহেবেরা ধর্ম বিকৃতকারীদের কিছু বিকৃত কথাকে ধর্মের নামে চালিয়ে দিয়ে সরলমনা মুসলিমদের ঈমানহারা করানোর চেষ্টা করেছেন নিঃসন্দেহে।

কোরবানী নিয়ে আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“খোদা তাআলা স্বপ্নে বলিয়াছেন, হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানী করো। এই ‘প্রিয় বস্তু’ কথাটির অর্থে ইব্রাহীম তাহার পুত্র ইসমাঈলকে বুঝিয়াছিলেন এবং তাই তাহাকেই কোরবানী করিয়াছিলেন। ইব্রাহীমের প্রিয় বস্তু তাহার ‘পুত্র’ না হইয়া তাহার ‘প্রাণ’ হইতে পারে না কি?”

আরজ আলী সাহেব এই জায়গাতেও জঘন্য একটা মিথ্যাচার করেছেন ইসলামে বিরুদ্ধে। সেটি হলো, আল্লাহ তাআলা নাকি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে স্বপ্নে বলেছেন, হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানী করো। এই মিথ্যাচার করে আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন-ইব্রাহীমের কাছে প্রিয় বস্তু তার নিজের প্রাণ না হয়ে ছেলের প্রাণ হলো কেন?

অথচ কুরআনে কোথাও এ রকম বলা হয়নি। কুরআনে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে ‘প্রিয় বস্তু’ বলে কোনো কিছুকে কোরবানী করতে বলা হয়নি; বরং কুরআন সুনির্দিষ্টভাবে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকেই কোরবানী করতে বলেছিলেন। দেখুন কুরআন কী বলে—

“অতঃপর যখন সে (পুত্রসন্তানটি) তার পিতার (ইব্রাহীম আ. এর) সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইব্রাহীম বলল, বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে কোরবানী করছি। এখন বলো, তোমার অভিমত কী? সে (ইসমাঈল আ.) বলল, “হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি অবশ্যই আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন”।[সূরা আস-সাফফাত (৩৭) : ১০২]

দেখুন, কুরআনে স্পষ্ট সন্তান কোরবানী করার কথা উল্লেখ করা আছে, কিন্তু আরজ আলী সাহেব করলেন কী? সন্তানের জায়গায় ‘প্রিয় বস্তু’ শব্দ বসিয়ে সরলমনা মুসলিমদের জন্য রচনা করলেন একটি আবেগতাড়িত রচনা। এটাই কি তাদের ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা এবং বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ নয়?

‘পাথরকে চুম্বন কেন?’ এ রকম শিরোনামে আরজ আলী সাহেব মক্কা শরীফে অবস্থিত পবিত্র পাথর ‘হাজরে আসওয়াদ’ কে চুম্বন করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেছেন,

“এই পাথর আরশ থেকে পতিত বলেই একে চুমু করা হয়। কিন্তু যাকে চুমু করা হয়, তার মমতাবোধ বা সুখানুভূতি থাকা আবশ্যক। যার মমতাবোধ বা সুখানুভূতি নাই, তাকে চুম্বন করার কোনো মানে থাকে না। হাজরে আসওয়াদ একখানা চেতনাবিহীন নিরেট পাথরমাত্র। তাকে চুম্বন করার উপকারিতা কী?”

আরজ আলী সাহেব ইসলামধর্মকে বাতুল প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি মূলত দারুণ একটি হাসির খোরাক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, “যাকে চুমু খাওয়া হয়, তার মধ্যে মমতাবোধ বা সুখানুভূতি থাকা আবশ্যক”। আচ্ছা, মা যখন সুদূর প্রবাসী ছেলের ফটোগ্রাফ, কিংবা মৃত সন্তানের ব্যবহার্য বা রেখে যাওয়া কোনো স্মৃতিকে চুমু খায়, আদর করে, বুকে জড়িয়ে রাখে, ওই ফটোগ্রাফ বা মৃত সন্তানের রেখে যাওয়া কোনো স্মৃতিবস্তুর মধ্যে কি কোনো রকম মমতাবোধ বা সুখানুভূতি আছে? মায়ের চুমু খেয়ে ছেলের ফটোগ্রাফ কি কথা বলে ওঠে? নাহ। এসবের কিছুই হয় না। তাহলে এ রকম একটি জড়বস্তুকে চুমু খাওয়ার, বুকে আগলে ধরার কি কোনো দরকার আছে?

এইবার আরজ আলী সাহেবের ভক্তগণ ফুঁসে উঠতে পারেন। তারা হয়তো বলবে, ‘আরে আরে! মা তো ফটোগ্রাফটিকে চুমু খেত না যদি না সেটা সন্তানের স্মৃতি বহন না করত। এটার মানে এই নয় যে, মা কেবল জড়বস্তুর মতন একটি ফটোগ্রাফকে চুমু খাচ্ছেন’।

ওয়েল! মুসলিমরাও ‘হাজরে আসওয়াদ’ নামক পাথরটিকে চুমু খেত না যদি না সেটা জান্নাতের পাথর হতো। মুসলিমরা এটাকে চুমু খায় কারণ, এই পাথর বিশেষ একটি স্মৃতি বহন করে। এটার মানে এই না যে, এই পাথরে চুমু খাওয়া মানে পাথরের ইবাদাত করা।

এই ‘হাজরে আসওয়াদ’ যে কেবল একটি পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়, সেটা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নিম্নোক্ত হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়ঃ

হাজরে আসওয়াদকে সম্বোধন করে একবার ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন,

“হে কালো পাথর, আমি অবশ্যই জানি তুমি নিছক পাথর, ভালো কিংবা মন্দ করার ক্ষমতা তোমার নেই। যদি আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাকে চুমু খেতে না দেখতাম, তাহলে আমি কখনোই তোমাকে চুমু খেতাম না”।[তিরমিযী, হাদিস : ৮৬০]

আরজ আলী মাতুব্বররা যেটা ইসলাম নয়, সেটাকেই ইসলাম বলে প্রচার করেছেন, আর যেটা সত্যিকারের ইসলাম, সেটা জেনে হোক বা না জেনে হোক, এড়িয়ে গেছেন।