মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ৭/১৩

(০৭) ঈশ্বর সংক্রান্ত

ঈশ্বর সংক্রান্তঃ

“ঈশ্বর সংক্রান্ত” শিরোনামের অধ্যায়ে আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব বেশ কিছু আপত্তি তুলে এনেছেন ঈশ্বর তথা স্রষ্টা সংক্রান্ত। এই অধ্যায়ে আমি চেষ্টা করব বিষয়টি ক্লিয়ার করতে।

আরজ আলী সাহেব হিন্দুধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম এবং ইসলামধর্মে স্রষ্টার ধারণা দিতে গিয়ে ইসলামের ব্যাপারে আপত্তি তুলে বলেছেন,

“মুসলিম ধর্মযাজকদের নিকট শোনা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা আরশে কুরছীর ওপরে বসিয়া রেজওয়ান নামক ফেরেশতার সাহায্যে বেহেস্ত, মালেক নামক ফেরেশতার সাহায্যে দোযখ, জেব্রাইলের সাহায্যে সংবাদ এবং মেকাইলকে দিয়া খাদ্য বণ্টন ও আবহাওয়া পরিচালনা করেন। সর্বশক্তিমান বিশ্বজগতের কার্যপরিচালনার জন্য ফেরেশতার সাহায্যের আবশ্যক কী?”

প্রথমেই বলি, কোনো বিষয়ে কথা বলতে হলে সে বিষয়টির জ্ঞান অথেনটিক সোর্স থেকে নিতে হয়। ইসলাম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এতই শোনা কথার ওপর নির্ভরশীল যে তার কথার জবাব দেওয়া অনেকটাই সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। তিনি বলেছেন, “মুসলিম ধর্মযাজকদের থেকে শোনা যায়” এ কথাটি আপত্তিজনক।

তিনি নিজে সোর্স পড়ে না দেখে মন্তব্য করার মাধ্যমে নিজেকে মূর্খদের কাতারে ফেলবেন এটা আমরা ধারণাও করতে পারি না। তারপর তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা আরশে কুরসির ওপর বসিয়া’ তার একথাটিও একটি মিথ্যা ও জঘন্যতম জগাখিচুড়ি টাইপের কথা। আল্লাহ আরশে কুরসির ওপর বসেছেন এটা মুসলিমরা বলে না, তা ছাড়া আরশ ও কুরসি ভিন্ন দুটি জিনিস, আরশের সামনে কুরসি অতীব ক্ষুদ্র জিনিস। সে কুরসীতে আসমান-যমীন কয়েকটি মুদ্রার মতো।

দ্বিতীয়ত, ফেরেশতাদের নিযুক্ত করা নিয়ে আরজ আলী সাহেব অত্যন্ত শিশুসুলভ একটি দাবির উত্থাপন করেছেন এখানে। তাঁর কথার সারমর্ম হচ্ছে, আল্লাহ যেহেতু সর্বশক্তিমান, তাই তিনি কেন ফেরেশতাদের সাহায্য নেবেন বিশ্বপরিচালনায়?

এখানে যে ভুলটি তিনি করেছেন তা হলো, ফেরেশতাদের তিনি আল্লাহর সাহায্যকারী ভেবে বসে আছেন। তিনি ধরেই নিয়েছেন যে আল্লাহ ফেরেশতাদের মুখাপেক্ষী। কিন্তু কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে,

“তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন।” [সূরা আল ইখলাস (১১২) : ০২]

আরজ আলী সাহেব এখানে ‘অধীনস্থ’ আর ‘সাহায্যকারী’-এর মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছেন। ফেরেশতাদের দিয়ে তিনি এই কাজগুলো করাচ্ছেন মানে এটা নয় যে তিনি ফেরেশতাদের সাহায্য নিচ্ছেন; বরং এটাই ফেরেশতাদের জন্য ইবাদাত। তারা আল্লাহর এসব কমান্ড ফলো করবে—এটাই তাদের ইবাদাত। তাদের এই কাজের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।

আমি চাইলেই আমার বাসার সকল কাজকর্ম নিজেই করতে পারি। কিন্তু আমার ইচ্ছে হলো যে, এসব আমি করব না। অন্যকে দিয়ে করাব। এরপর আমি যদি এমন অত্যাধুনিক একদল রোবট তৈরি করি যাদের কেউ আমার কাপড় ধুয়ে দেবে, কেউ কাপড় ইস্তিরি করে দেবে, কেউ আমার রান্নাবান্না করে দেবে, কেউ আমার রিডিং রুম আর বেড রুম গুছিয়ে দেবে, কেউ আমার ব্যবসায়ের হিসাবপত্র মিলিয়ে দেবে, কেউ বাগান পরিচর্যা করবে ইত্যাদি। আমি যদি আমার বাসায় সকল কাজ আমারই তৈরি অত্যাধুনিক রোবটকে দিয়ে করাই, তাহলে এর দ্বারা কি এটাই প্রমাণ হয় যে আমি আসলে আমার বাসার কাজকর্ম করতে অক্ষম? নাহ, এটা প্রমাণ হয় না; বরং এতে আমার সম্মান, ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আমারই তৈরি একদল সুপার রোবট দল যখন কেবল আমার নির্দেশনামতো সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে যায়, তখন আমার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, আর অসাধারণ সৃষ্টিশৈলী প্রকাশ পায়। আমি কিন্তু কোনোভাবেই আমার তৈরি রোবটের অধীন বা মুখাপেক্ষী নই; বরং তারাই আমার মুখাপেক্ষী।

তারা আমার তৈরি প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে যেতে বাধ্য। আমি ইচ্ছে করলেই তাদের প্রোগ্রাম চেইঞ্জ করে দিতে পারি। আমি সেই ক্ষমতা রাখি। সুতরাং ফেরেশতাদের দিয়ে বিশ্ব পরিচালনা করাটা আল্লাহর সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটা তাঁর ক্ষমতারই একটা অংশ। আরজ আলী এই জায়গায় এসে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“আল্লাহ তা’লা দেখেন, শোনেন, বলেন ইত্যাদি শুনিয়া সাধারণ মানুষের মনে স্বতই প্রশ্ন জাগে—তবে কি আল্লাহর চোখ, কান ও মুখ আছে? কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, আছে। তবে তাহা মানুষের মতো নয়, কুদরতি। কিন্তু ‘কুদরতি’ বলিতে কীরূপ বুঝায়, তাহা তাহারা ব্যাখ্যা করেন না। আবার যখন শোনা যায় যে, খোদা তা’লা অন্যায় দেখিলে ক্রুদ্ধ হন, পাপীদের ঘৃণা করেন, কোন কোন কাজে খুশী হন ও কোন কোন কাজে বেজার হন, তখন মানুষ ভাবে—খোদার কি মানুষেরই মতো মন আছে? আর খোদার মনোবৃত্তিগুলি কি মানুষেরই অনুরূপ?”

আরজ আলী সাহেবের যুক্তি হচ্ছে, রাগ করা, ক্রুদ্ধ হওয়া, খুশি-বেজার হওয়া মানবীয় গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহও যেহেতু কারও অন্যায় দেখলে রাগ করেন, ক্ষুব্ধ হন, বেজার হন, ভালো কাজ দেখলে খুশি হন, তাহলে আল্লাহও কি মনুষ্যভাবাপন্ন কি না? অর্থাৎ আল্লাহর মধ্যে মানুষের মতো গুণাবলি আছে কি না?

প্রথমত, আল্লাহ দেখেন, শোনেন। এগুলো আল্লাহর সিফাত বা গুণ। মানুষও দেখে, শুনে। এর মানে কোনোভাবেই এটা বোঝায় না যে, আল্লাহর মধ্যে মানবীয় গুণাবলি আছে।

আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞাত। অর্থাৎ তিনি সবকিছুই জানেন। এখন তিনি যদি মানুষকে ‘জানা’ মানে কী এই জ্ঞানটা না দিতেন, অর্থাৎ মানুষ যদি না-ই বুঝত যে ‘জানা’ বলতে আসলে কি বোঝায়, তাহলে তারা কীভাবে অনুধাবন করতে পারত যে আল্লাহ সর্বজ্ঞাত?

আল্লাহ সর্বশ্রোতা, অর্থাৎ তিনি সবকিছুই শোনেন। এমতাবস্থায় মানুষকে যদি তিনি ‘শোনার’ ক্ষমতা না দিতেন, তাহলে মানুষ কীভাবে উপলদ্ধি করত যে তিনি সর্বশ্রোতা? আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা, অর্থাৎ তিনি সবকিছুই দেখেন। এখন তিনি যদি মানুষকে ‘দেখা’-এর ক্ষমতাই না দিতেন, তাহলে মানুষ কীভাবে বুঝতে পারত যে আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা?

আল্লাহ এই দেখার, জানার, শোনার গুণাবলি দিয়েই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যাতে করে মানুষ আল্লাহর ক্ষমতা বুঝতে পারে। কিন্তু এটা কোনোভাবেই বোঝায় না যে আল্লাহ মনুষ্যভাবাপন্ন। আল্লাহর দেখা, জানা, শোনার সাথে মানুষের দেখা, জানা আর শোনার কোনো তুলনা হতে পারে না; বরং প্রতিটি সত্তা অনুসারেই তার গুণাগুণ নির্ধারিত হয়ে থাকে। প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই গুণাগুণ আলাদা হয়ে থাকে। একটা মাছি শোনে আবার গরুও শোনে, তাই বলে এতদুভয়ের শোনা এক রকম নয়। একটি ডিভাইসও শোনে ও দেখে একটি মশাও শোনে ও দেখে কিন্তু তাদের মধ্যে কত পার্থক্য! সুবহানাল্লাহ, তাহলে স্রষ্টার গুণাগুণ সৃষ্টির মতো কেন হতে হবে?

আসলে আরজ আলী গংরা যদি স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন তখন গুণের প্রশ্নটির সমাধান পরে করা যাবে, আগে যেখানে তারা অস্তিত্বই মানছেন না সেখানে অন্য কথা বলা তাদের বাতুলতা বৈ নয়। যদি অস্তিত্ব মেনে নেন তবে মানতে হবে যে অস্তিত্বশীল সত্তার কোনো না-কোনো গুণ থাকবেই, সে গুণের প্রকৃত স্বরূপ আমাদের জানা থাকার প্রয়োজন নেই। তবে এতটুকু অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, স্রষ্টার গুণাগুণ আলাদা যেমনি তার অস্তিত্ব আলাদা, সৃষ্টির কারও মতো করে তাঁর সত্তাকে কিংবা গুণকে ধারণা করা সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতা; কারণ, তা না জেনে মন্তব্য করা।

আর এ জন্যই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

“তার সদৃশ কোনো কিছুই নেই।” [সূরা আশ-শূরা (৪২) : ১১]

আল্লাহ মানুষকে ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই মানুষ দেখতে পারে, শুনতে পারে, বুঝতে পারে। এটাকে আল্লাহর ক্ষমতার সাথে গুলিয়ে আল্লাহকে মনুষ্যভাবাপন্ন জ্ঞান করাটা নেহায়েত মূর্খতা। তিনি বলেছেন,

“ঈশ্বর যদি উনার সৃষ্ট পদার্থ হইতে ভিন্ন হন, তাহা হইলে তাহার সর্বব্যাপিত্ব থাকিতে পারে না। এবং ঈশ্বরের সর্বব্যাপিত্ব অক্ষুন্ন থাকিলে কোন সৃষ্ট পদার্থ এমনকি পদার্থের অণু-পরমাণুও ঈশ্বরশূন্য হইতে পারে না।”

উনার পয়েন্ট হলো, আল্লাহ যদি সর্বব্যাপী, সবখানেই বিরাজ করেন, তাহলে তিনি কি নাপাক বস্তুর মধ্যেও বিরাজ করেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে তিনি আর পরম, মহা পবিত্র সত্তা কীভাবে হন?

এখানে আরজ আলী সাহেব যে জিনিসটা বুঝতে ভুল করেছেন তা হলো আল্লাহ তা’আলার সর্বব্যাপিত্ব। উনি আল্লাহর সর্বব্যাপিত্ব বলতে ধরেই নিয়েছেন যে আল্লাহ জগতের সকল বস্তুর মধ্যেই বিরাজ করছেন। পাক-নাপাক সকল বস্তুর মধ্যেই। মূলত আল্লাহ তা’আলা তাঁর আরশের ওপরে রয়েছেন। তিনি সকল বস্তুর মধ্যে বিরাজমান নন; বরং তাঁর জ্ঞান ও দৃষ্টিই সকল বস্তুকে ঘিরে আছে। এটাই হলো আল্লাহর সর্বব্যাপিতা।

প্রসিদ্ধ চার ইমামের মতও এটাই যে, আল্লাহ তাঁর আরশের ওপরে রয়েছেন কিন্তু তাঁর জ্ঞান দ্বারা তিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।

যেমন ইমাম আবু হানিফা বলেছেন,
“যে বলবে, আল্লাহ আসমানে আছেন না যমীনে তা আমি জানি না, সে কাফের হয়ে যাবে; কেননা, আল্লাহ বলেন, রহমান আরশের ওপরে আর তাঁর আরশ সপ্ত আকাশের ওপরে।” [ইজতিমাউল জুয়ুসিল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা : ৯৯]

ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
“আল্লাহ আকাশের ওপর এবং তাঁর জ্ঞানের পরিধি সর্বব্যাপী বিস্তৃত। কোনো স্থানই তাঁর জ্ঞানের আওতার বহির্ভূত নয়।” [ইজতিমাউল জুয়ুসিল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা : ১০১]

ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন,
“সুন্নাহ সম্পর্কে আমার ও আমি যে সকল হাদীসের বিদ্বানদের দেখেছি এবং তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছি যেমনঃ সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যরা, তাদের মত হলো এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আর আল্লাহ আকাশের ওপরে তাঁর আরশের ওপর রয়েছেন। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হন এবং যেভাবে ইচ্ছা নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন।” [ইজতিমাউল জুয়ুসিল ইসলামিয়্যাহ, ১২২]

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর পুত্র আবদুল্লাহ বলেন,
“আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, সপ্তম আকাশের ওপরে তাঁর আরশের ওপর রয়েছেন। তাঁর ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিধি সর্বত্র বিস্তৃত। এর উত্তরে তিনি (ইমাম আহমাদ) বলেন, হ্যাঁ, তিনি আরশের ওপরেই আছেন কিন্তু তাঁর জ্ঞানের বহির্ভূত কোনো কিছুই নেই।” [ইজতিমাউল জুয়ুসিল ইসলামিয়্যাহ, ১৫২-১৫৩]

ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ্ আরও বলেন,
“যে বলবে যে আল্লাহ আসমানে আছেন না যমীনে আছেন তা আমি জানি না সে কাফির হয়ে যাবে, অনুরূপভাবে যে বলবে যে তিনি আরশে আছেন কিন্তু আরশ আকাশে না যমীনে অবস্থিত তা আমি জানি না, সেও কাফির হয়ে যাবে। কেননা, ওপরে থাকার জন্যই আল্লাহকে ডাকা হয়। নিচে থাকার জন্য নয়। আর নিচে থাকাটা আল্লাহর রুবুবিয়্যাত এবং উলুহিয়্যাতের গুণের কিছুই নয়।” [আল ফিকহুল আবসাত, পৃষ্ঠা : ৫১]

বস্তুত আল-কুরআনের আয়াত থেকেই ইমামগণ এ আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করেছেন, যেমন আল্লাহ বলেন,

“দয়াময় আল্লাহ আরশের ওপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বহা (২০) : ০৫]

“তিনিই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের ওপর উঠেছেন।” [সূরা আল-হাদীদ (৫৭) : ০৪]

“তোমরা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছ যে যিনি আরশের ওপরে আছেন তিনি ভূমিসহ তোমাদের ধসিয়ে দেবেন না?” [সূরা আল-মূলক (৬৭) : ১৬]

অনুরূপভাবে হাদীসে আছে,

“মুআওয়িয়া ইবন আল হাকাম আস-সুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার একজন দাসী ছিল। উহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ নামক স্থানে সে আমার ছাগল চরাত। একদিন দেখি, নেকড়ে আমার একটি ছাগলকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি এক আদমসন্তান। তারা যেভাবে ক্ষুদ্ধ হয়, আমিও সেভাবে ক্ষুদ্ধ হই। ফলে আমি তাকে থাপ্পড় মেরে বসি। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসলে আমি একে এক সাংঘাতিক (অন্যায়) কাজ বলে গণ্য করি। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি তাকে মুক্ত করে দেবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে আসো। আমি তাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ কোথায়?’ সে বলল, আসমানে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কে?” সে বলল, “আপনি আল্লাহর রাসূল।” তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাকে মুক্তি দিয়ে দাও। কারণ, সে একজন ঈমানদার নারী।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৩৭]

দেখা যাচ্ছে, দাসীটাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো আল্লাহ কোথায়, সে জবাব দিলো, আসমানে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এই জবাবকে সঠিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাহলে কুরআন, হাদীস এবং মাযহাবের ইমামদের মতামত থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ আরশেই আছেন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী।

কুরআনের এই আয়াত স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, আল্লাহর জ্ঞানই আমাদের পরিবেষ্টন করে আছে।

“আর আল্লাহ (স্বীয়) জ্ঞানে সবকিছুকে ঘিরে রেখেছেন।” [আত তালাক (৬৫) :১২]

সুতরাং আরজ আলী সাহেব সকল বস্তুর মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি ধরে নিয়ে যে তর্ক তুলেছেন, তা আমরা পুরোপুরি বাতিল ও অসংলগ্ন জ্ঞান থেকে উত্থিত বলে সুস্পষ্টভাবে বলতে পারি।

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“সুপারিশ রক্ষার অর্থই হইল, আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করা। অর্থাৎ স্বয়ং যাহা করিতেন না, তাহাই করা। ঈশ্বর কি কোনো ব্যক্তিবিশেষের অনুরোধ বা সুপারিশে আপন ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিবেন না?”

আরজ আলী সাহেবের এ প্রশ্নটির দুটি দিক আছে। একটি হচ্ছে, কিছু কিছু মানুষের ধারণা যে আল্লাহ তাদের পীর বা ওলীদের সুপারিশের অধিকার দিয়েছেন, তারা সুপারিশ করে মানুষের তাকদীরে পরিবর্তন সাধন করে দেবে। কিন্তু এটাও আরজ আলী সাহেবদের ইসলাম সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞান থেকে উত্থিত। কারণ, তিনি জানেন না যে সুপারিশের মালিক আল্লাহ তাআলা। [সূরা আয-যুমার (৩৯) : ৪৪]। তিনি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর বান্দাগণের মধ্যে যার ওপর তাঁর সন্তুষ্টি রয়েছে তাকে হাশরের দিন অনুমতি দেবেন সুপারিশ করার জন্য, তিনি তখন সুপারিশ করার সুযোগ লাভ করবেন। সত্যিকারের মুসলিম এটা বিশ্বাস করে যে তথাকথিত কবরবাসী কারও জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না, কোনো পীর সাহেবও নয়, কোনো মাছ বা গাছ তো নয়ই। সুতরাং সুপারিশের মূল অধিকার আল্লাহর হাতেই। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করলে সেটা থেকে তার ক্ষমতাহীন হওয়া সাব্যস্ত হয় না। তা ছাড়া সবার সুপারিশের পরে তিনি নিজে এমন অনেককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন যাদের জন্য কারও সুপারিশ হয়নি, কিন্তু তাদের ঈমান ছিল।[মুসনাদে আহমাদ, ৯২০২]।

হয়ত আরজ আলী সাহেবদের কাছে সুপারিশকে আল্লাহর ক্ষমতার সীমাবদ্ধকরণ মনে হচ্ছে, কিন্তু বস্তুত কাজটা এ রকম নয়। যিনি মহান, তিনি সব সময় তাঁর কাছে অপরের কাছ থেকে আশা করেন যে কেউ আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করুক আমি তাকে দিই। দুনিয়ার বুকেও সেটা স্পষ্ট। মহান আল্লাহ তাআলা দাতা, ক্ষমাশীল, দয়াকারী, তাঁর এ নাম ও গুণের দাবি হচ্ছে তাঁর কাছে সবাই প্রার্থনা করুক আর তিনি দেবেন। এর মাধ্যমেই তাঁর মহত্ত্ব ফুটে উঠবে। আরজ আলী সাহেবদের মতো লোকেরা তা কীভাবে বুঝবে?

দ্বিতীয়ত, আরজ আলী সাহেবদের হয়তো মনে হতে পারে যে তাকদীর নির্ধারিত থাকলে আবার সুপারিশ করলে সেটা পরিবর্তন কীভাবে হবে? এ হিসেবে আরজ আলী সাহেবের এই প্রশ্নটা ‘তাকদীর’ সম্পর্কিত। তাকদীর সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকলে যে কেউ এমন বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্ন করে বসতে পারে।

তাকদীর হলো পূর্বনির্ধারিত। তাহলে প্রশ্ন, আল্লাহই কি নিজের ইচ্ছেমতো তাকদীর লিখে মানুষের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে মানুষ পাপ করলে তার দায়ভার তো স্বয়ং আল্লাহর। মানুষ কেন শাস্তি পাবে? ব্যাপারটা আসলে সে রকম নয়। এটা ঠিক যে তাকদীর পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু এটা জানা আবশ্যক যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন ‘আলিমুল গায়েব’ অর্থাৎ পূর্বাপরের সকল বিষয়ে সম্যক জ্ঞানী। তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা। মানুষকে তিনি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু মানুষের মেকানিজমের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা এবং তিনি জানেন ভবিষ্যতে ঠিক কী কী হবে, তাই তিনি এও জানেন যে, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে একজন মানুষ কোন কোন কাজগুলো করতে পারেন। যেহেতু তিনি সে সম্পর্কে অবহিত, তাই তিনি তা লিখে রেখেছেন। তবে তিনি কি ব্যক্তিবিশেষের ফরিয়াদ রাখেন না? রাখেন। এই রাখাটাও তাঁর পূর্বতন তাকদীর নির্ধারণের সময় লিখে রেখেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন যে অমুক ব্যক্তি অমুক সমস্যায় পড়বে আর দো‘আ করতে সমর্থ হবে, অথবা তার জন্য জীবিত সক্ষমরা দো‘আ করবে, অথবা সে সাদাকা করতে পারবে সুতরাং সে দোআ, সাদাকার কারণে তার বিপদ থেকে মুক্তি ঘটবে, কিন্তু বান্দা তো জানে না তার তাকদীরে কী আছে, সে তো মনে করছে এ বিপদই হয়তো তাকে শেষ করে দেবে, কিন্তু আল্লাহ জানেন যে তার আরও সুযোগ রয়েছে; কারণ, এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য সে এমন কিছু কাজ করবে যা তার কাজে লাগবে। সুতরাং “বান্দার দায়িত্ব হচ্ছে কাজ করে যাওয়া, তাকদীরে কী লেখা আছে তা খুঁজে বেড়ানো নয়।” [বুখারী, ৪৯৪৫; মুসলিম, ২৬৪৭]। আবার কখনো কখনো বিনা সুপারিশেই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে উদ্ধার করেন, এসবই তাঁর একান্ত দয়া। তাঁর দয়াকে অন্য কেউ নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, দয়া না করার জন্যও বলতে পারে না। তবে সেটা ভিন্ন যেটা তিনি বলে দিয়েছেন; যেমন তিনি বলে দিয়েছেন যে নাস্তিক, মুশরিক, কাফির ও মুনাফিকদের তিনি দয়া করবেন না।

ধরুন, আমরা জানি আল্লাহ হলেন ধনভান্ডারের আধার। এখন একজন গরিব লোক যদি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে তার দরিদ্র বিমোচনের জন্য এবং দোয়া কবুল হয়ে যদি ওই ব্যক্তির দরিদ্রতা দূর হয়, তাহলে কি এর অর্থ এটাই যে এতে আল্লাহর ইচ্ছার ব্যাঘাত ঘটেছে? বরং আল্লাহ অপার ভান্ডার নিয়ে বসে আছেন। কেউ চাইল আর তিনি দান করলেন। এতে করে তার দয়াশীলতা প্রকাশ পায়।

আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন,

“অন্যান্য ক্ষেত্রে যাহাই হউক না কেন, বিচারক্ষেত্রে ‘ন্যায়’ ও ‘দয়ার’ একত্র সমাবেশ অসম্ভব। কেননা, দয়া করিলে ন্যায়কে উপেক্ষা করিতে হইবে এবং ন্যায়কে বজায় রাখিতে হইলে দয়া-মায়া বিসর্জন দিতে হইবে। বলা হয়, আল্লাহ ন্যায়বান এবং দয়ালু। ইহা কীরূপে সম্ভব? তবে কি তিনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যায়বান আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে দয়ালু?”

আরজ আলী সাহেব এই প্রশ্নের একটা জায়গায় অবশ্য ঠিক আছেন। তিনি বলেছেন, “বিচারক্ষেত্রে ন্যায় ও দয়ার একত্র সমাবেশ অসম্ভব।” আসলেও তা-ই। বিচারক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই ন্যায়বান হতে হবে। কিন্তু আরজ আলী দুটোকে পরস্পর বিপরীতমুখী দাঁড় করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বিচারক্ষেত্রে একজন বিচারক ন্যায়বান থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই তো স্বাভাবিক হওয়ার কথা। একজন বিচারক বিচারক্ষেত্রে যদি ন্যায়বান না-ই থাকেন, তাহলে কী ঘটবে? একজন চোর চুরির শাস্তি পাবে না। ধর্ষক ধর্ষণের শাস্তি পাবে না। অন্যায়কারী খুব সহজেই পার পেয়ে যাবে। তখন কী হবে? সমাজে ন্যায় বলে কিছু থাকবে না। অন্যায় আর পাপে ডুবে যাবে সমাজ।

ধরুন আপনি একজন বিচারক। আপনার সামনে দুজন আসামী আনা হলো। এদের দুজন থেকে যেকোনো একজন আসামী। এখন সাক্ষ্যপ্রমাণের পর, আসামী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও আপনি কি আসামীটাকে ছেড়ে দেবেন? যদি দেন, তাহলে একই সাথে আপনি বেশ কিছু অপরাধ করবেন। প্রথমত, আপনি আসামীকে ছেড়ে দিয়ে অন্যায় করেছেন। দ্বিতীয়ত, নির্দোষ লোকটিকে আপনি ‘ন্যায়বিচার’ থেকে বঞ্চিত করে তার প্রতি নির্দয় হয়েছেন।

কিন্তু যদি আপনি এখানে ন্যায়বিচার করতেন তো কী হতো? আপনি যদি ন্যায়বিচার করতেন তাহলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা পেত এবং সাথে সাথে আপনি নির্দোষ লোকটির প্রতিও সদয় হতেন।

দয়ালু হওয়ার মানে এই না যে, আপনাকে চোর-ডাকাত-ধর্ষককে ছেড়ে দিতে হবে; বরং দয়ালু হবার অর্থ এই যে, আপনি আপনার অবস্থানে ন্যায়বান থেকে দয়াপরবশ হবেন।

আল্লাহ তাআলা যদি বিচারের সময় তাঁর সাথে কৃত অপরাধ, যা একান্তভাবে তার অধিকার, যেমন সাওম পালন না করা, হজ্জ না করা ইত্যাদি অপরাধ ক্ষমা করে দেন, আর নিজের পক্ষ থেকে অধিকারে ছাড় দেওয়া ও ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি সারা দুনিয়াতে সভ্যসমাজে প্রশংসিত বিবেচিত হয়ে এসেছে, তাহলে সেখানে কার কী বলার আছে? অন্যদিকে যদি বিচারের সময় অন্যের ওপর কৃত অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি ইত্যাদির ব্যাপারে উভয়কে ডেকে বিচারের সময় রাজি ও সস্তুষ্ট করে দিতে পারেন তাহলে আপনি তৃতীয় পক্ষ এ ব্যাপারে কথা বলার কে? বান্দার অধিকারের ব্যাপারে বিচারের মূল উদ্দেশ্যই তো বাদী-বিবাদী উভয়ের সন্তুষ্টি, তৃতীয় পক্ষের সন্তুষ্টি নয়। সুতরাং আরজ আলী সাহেব এখানে সমীকরণ দাঁড় করতেই ভুল করেছেন। তিনি নৈতিকতার সাথে অনৈতিকতাকে গুলিয়ে জগাখিচুড়ি তৈরি করেছেন বলা যায়।

আরেক স্থানে আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“বলা হয় যে, আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন ঘটনা ঘটে না। এমনকি গাছের পাতাও নড়ে না। বিশেষত, তাহার অনিচ্ছায় যদি কোন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহা হইলে তাহার ‘সর্বশক্তিমান’ নামের সার্থকতা কোথায়? আর যদি আল্লাহর ইচ্ছায়ই সকল ঘটনা ঘটে, তবে জীবের দোষ বা পাপ কী?”

এই ব্যাপারটাও তাকদীর সম্পর্কিত। আরজ আলী মাতুব্বরের যে তাকদীর সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই ছিল না, এই প্রশ্নগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ সর্বশক্তিমান মানে এই নয় যে, জীব তথা মানুষের দোষ বা পাপ কেবল তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে চলেছে। আগেই বলেছি, আল্লাহ মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।

আবার, আল্লাহ হলেন ‘আলিমুল গায়েব’ বা ‘ভবিষ্যদ্রষ্টা’। তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা। মানুষের মেকানিজম তিনিই তৈরি করেছেন। তিনিই মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন। এখন, তিনি যেহেতু ভবিষ্যদ্রষ্টা অর্থাৎ ভবিষ্যৎ দেখতে পান, তাই তিনি জানেন এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে মানুষ কী কী কাজ করবে। তাই আল্লাহ সেই কাজগুলোকে তিনি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন ভাগ্যলিপি হিসেবে। এটাই সাধারণ অর্থে তাকদীর। এর মানে এই না যে, আল্লাহ লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ সেই কাজগুলো করছে; বরং এর মানে এই যে, আল্লাহ আলিমুল গায়েব। তিনি জানেন ভবিষ্যতে কী হবে আর কে কী করবে। তিনি জানেন বলেই সেগুলো লিখে রেখেছেন, ব্যস!

একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক একটি স্কুলের একজন ম্যাথ টিচারের আন্ডারে পাঁচ জন ছাত্র আছে। ম্যাথ টিচার জানে এই পাঁচ জনের মধ্যে কার মেধা কতটুকু। ম্যাথে কার দক্ষতা কতটুকু সেসব ম্যাথ টিচার খুব ভালো করেই জানেন। এখন ধরুন, পরীক্ষার আগে সেই ম্যাথ টিচার একটি কুপনে ওই পাঁচ জনের নাম এবং আসন্ন পরীক্ষায় ম্যাথে ওই পাঁচ জনের কে কী রকম মার্কস পাবে তাও লিখে রাখলেন। ধরুন, সেটা এ রকমঃ

রাকিবঃ ৯০
রাব্বিঃ ৯৫
সিয়ামঃ ৮২
রাশেদঃ ৭০
এবং মুরাদঃ ৫৫

আবার ধরুন, পরীক্ষা শেষে দেখা গেল ম্যাথ টিচার ঠিক যে ফলাফল আগে লিখে রেখেছিলেন, প্রত্যেকে ঠিক সেই পরিমাণ মার্কসই পেয়েছে।

তাহলে প্রশ্নঃ ম্যাথ টিচার আগে থেকেই লিখে রেখেছে বলেই কি ওই পাঁচ জন এ রকম রেজাল্ট করেছে? উত্তর হলোঃ ‘না’।

ম্যাথ টিচার আগে থেকেই তাদের মেধা সম্পর্কে জানতেন বলেই তিনি অনুমান করতে পেরেছেন কে কী রকম রেজাল্ট করবে। তাই তিনি লিখে রেখেছেন। এতে করে এটা প্রমাণ হয় না যে ম্যাথ টিচার লিখে রেখেছেন বলেই ছাত্ররা এ রকম রেজাল্ট করেছে। ঠিক সেভাবে, আল্লাহও আগে থেকে জানেন বলেই তিনি মানুষের ভাগ্য লিখে রেখেছেন। এতে করে এটা প্রমাণ হয় না যে আল্লাহ লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ দোষ বা পাপগুলো করছে।

কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, ম্যাথ টিচারের অনুমান তো ভুলও হতে পারে। জি, ম্যাথ টিচারের অনুমান ভুল হতেই পারে। কারণ, তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন না। তিনি ভবিষ্যৎ জানেন না। তিনি স্রেফ অনুমান করতে পারেন। এ জন্য তার জানায়, তার অনুমানে ভুল হতেই পারে। কিন্তু আল্লাহ তো এ রকম নন। তিনি ভবিষ্যৎ জানেন। তাই তাঁর জানায় কোনো ভুল হতে পারে না। আরজ আলী সাহেব এখানে তাকদীর সম্পর্কে না জেনে, পড়াশুনা না করেই প্রশ্ন করে বসেছেন। এখানে একটি বিষয় জানানো জরুরি মনে করছি, তা হচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা দু-ধরনেরঃ

১। কাউনিয়্যাহ বা প্রাকৃতিক
২। শারইয়্যাহ বা শরীআতগত

১। কাউনিয়্যাহঃ এ ধরনের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হয়। তবে জিনিসটি আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হওয়ার ব্যাপারটি জরুরি নয়। আর এটা দ্বারাই আল্লাহর ‘মাশিয়াত’ বা ইচ্ছা বোঝানো হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقْتَتَلُوا۟ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ

“আল্লাহ চাইলে তারা পরস্পরে লড়াই করতে পারত না, কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই করেন।” [সূরা বাকারা (০২): ২৫৩]

إِن كَانَ ٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يُغْوِيَكُمْ هُوَ رَبُّكُمْ

“যদি আল্লাহই তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান (তাহলে কোনো নসিহতই কাজে আসবে না)। তিনিই হচ্ছেন তোমাদের রব।” [সূরা হূদ (১১) :৩৪]

২। শারইয়্যাহঃ এ ধরনের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহর ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য নয়। তবে এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত জিনিস বা বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয় হতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

وَٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ

“আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিতে চান।” [সুরা নিসা (০৪) : ২৭]

আমরা আরও ঈমান আনি যে, আল্লাহ তাআলার কাউনী এবং শারয়ী উভয় ইচ্ছাই তাঁর হিকমতের অধীন। আল্লাহ তাআলা স্বীয় কাউনী ইচ্ছানুযায়ী যা ফয়সালা করেন অথবা শারয়ী ইচ্ছানুযায়ী বান্দা [মাখলুক] যে ইবাদত করে উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর হিকমত নিহিত রয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহর হিকমতের কিছু আমরা বুঝতে সক্ষম হই বা না হই অথবা আমাদের বিবেক-বুদ্ধি এ ক্ষেত্রে অক্ষম হলেও কিছু যায় আসে না। [সর্বাবস্থাতেই তিনি সবচেয়ে বড় হাকীম]

أَلَيْسَ ٱللَّهُ بِأَحْكَمِ ٱلْحَٰكِمِينَ

“আল্লাহ কি সবচেয়ে বড় হাকীম নন?” [সূরা তীন (৯৫) : ৮]

وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ

“যারা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ী তাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুমের অধিকারী আর কে হতে পারে?” [সূরা মায়েদা (০৫) : ৫০]

আমরা ঈমান আনি যে,

ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَىْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ وَكِيلٌ - لَّهُۥ مَقَالِيدُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ-

“আল্লাহ তাআলা সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা। তিনি সবকিছুরই অভিভাবক। আসমান ও যমীনের ধন-ভান্ডারের চাবি তাঁরই কাছে সংরক্ষিত।” [যুমার (৩৯) : ৬২-৬৩]

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এবং তাঁর বান্দার পক্ষ থেকে যা কিছু সংঘটিত হবে, তা চাই কথা হোক, কাজ হোক অথবা অমান্য করাই হোক না কেন এর সবকিছুই উক্ত চারটি স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এর সবই তাঁর জানা এবং তাঁর কাছে লেখা রয়েছে। এর সবকিছুই তাঁর ইচ্ছা ও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত।

لِمَن شَآءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ - وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ

“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সোজা-সরল পথে চলতে চায় (তার জন্য এ কিতাব উপদেশস্বরূপ) আর যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা না চান ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের চাওয়ায় কিছুই হয় না।” [সূরা আত-তাকভীর (৮১): ২৮-২৯]

وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ

“আল্লাহ চাইলে তারা এ রকম করত না। কাজেই তাদের ছেড়ে দাও। নিজেদের মিথ্যা রচনায় তারা নিমগ্ন থাকুক।” [সূরা আনআম (০৬) : ১৩৭]

وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقْتَتَلُوا۟ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ

“আল্লাহ চাইলে তারা কখনো লড়াই করত না। কিন্তু আল্লাহ যা চান তা-ই করেন।” [সূরা বাকারাহ (০২) : ২৫৩]

وَٱللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

“আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা করো তাও সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা সাফফাত (৩৭) : ৯৬]

এরপরও আমরা ঈমান আনি, যেকোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে এখতিয়ার এবং কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন। বান্দার কাজ যে তার এখতিয়ার এবং ক্ষমতায় সংঘটিত হয়ে থাকে তার কিছু প্রমাণঃ

১. আল্লাহ তাআলার বাণীঃ

فَأْتُوا۟ حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ

“তোমাদের ইচ্ছামাফিক তোমাদের ক্ষেত্র [স্ত্রীদের কাছে] গমন করো।” [সূরা বাকারাহ (০২) : ২২৩]

وَلَوْ أَرَادُوا۟ ٱلْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا۟ لَهُۥ عُدَّةً

“তারা যদি বের হওয়ার ইচ্ছা সত্যিই পোষণ করত, তাহলে তারা অবশ্যই সে জন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করত।” [সূরা তাওবা (০৯) :৪৬]

উক্ত আয়াত দুটিতে বান্দার ইচ্ছা পোষণ করা এবং ইচ্ছানুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছে।

২. যদি বান্দার কাজ করার কোনো এখতিয়ার ও ক্ষমতাই না থাকে তাহলে বিধি-নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে যে নির্দেশ ও উপদেশ বান্দাকে দেয়া হয়েছে তার অর্থ দাঁড়ায়, বান্দাকে এমন কাজের প্রতি নির্দেশ দেয়া, যা করার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। অথচ এমনটি হওয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর করুণা, হিকমত ও কৌশলের পরিপন্থী। সাথে সাথে আল্লাহর এ ঘোষণার সম্পূর্ণ বিপরীতঃ

لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

“আল্লাহ কারও ওপরই তার শক্তি-সামর্থ্যের অধিক বোঝা চাপিয়ে দেন না।” [সূরা বাকারা (০২) : ২৮৬]

৩. মুহসীন ব্যক্তির ইহসানের প্রশংসা এবং খারাপ ব্যক্তির খারাপ কাজের নিন্দা করা আর উভয়কেই তার কৃতকর্মের প্রাপ্য পুরস্কার বা শাস্তিপ্রদানের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে একটি দলীল। যদি বান্দার কর্ম তার ইচ্ছা ও এখতিয়ার অনুযায়ী কোনো কাজ সংঘটিত না-ই হতো তাহলে মুহসিন ব্যক্তির ইহসানের প্রশংসা করার কোনো অর্থই হয় না। আর অন্যায়কারীর অন্যায়ের জন্য শাস্তিপ্রদান যুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ আল্লাহ তাআলা কোনো অর্থহীন কাজ করা এবং যুলুম করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।

৪. আল্লাহ তাআলা রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন,

مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةٌۢ بَعْدَ ٱلرُّسُلِ وَكَانَ ٱللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا

“সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে। যেন তাঁদের পাঠাবার পর আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে লোকদের কোনো যুক্তি না থাকে। আল্লাহ তো সর্বাবস্থায় মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আন নিসা (৪) : ১৬৫]

কাজ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে যদি বান্দার ইচ্ছা ও শক্তি কাজে লাগানোর কোনো এখতিয়ারই না থাকে তাহলে রাসূল পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহর বিরুদ্ধে বান্দার হুজ্জত (যুক্তি) বাতিল বলে গণ্য হতো না।

৫. কার্য সম্পাদনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই কাজ করার সময় কোনো রকম জবরদস্তির অনুভূতি ও ধারণা পোষণ করা ছাড়াই কাজ করে। সে দাঁড়ায়, বসে, প্রবেশ করে, বের হয়, সফর করে, আবার মুকীম হয় সম্পূর্ণ তার নিজ ইচ্ছানুযায়ী। সে এ কথা মনে করে না যে, কেউ তাকে এসব করার জন্য বাধ্য করছে কিংবা জবরদস্তি করছে। বরং বান্দা নিজেই স্বতঃস্ফূর্ত কাজ আর জবরদস্তিমূলক কাজের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য বের করে। এমনিভাবে শরীআত ও এ দু-ধরনের কাজের মধ্যে পার্থক্য করে থাকে। ফলে জবরদস্তির শিকার হয়ে যদি বান্দা আল্লাহর হকের ব্যাপারে কোনো কাজ করে ফেলে তাহলে এর জন্য কোনো শাস্তি হবে না।

আমরা মনে করি পাপী ব্যক্তির জন্য তার পাপ কাজের পক্ষে ‘ত্বাকদীর’ দ্বারা যুক্তি পেশ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, পাপী তার নিজ এখতিয়ার ও শক্তির বলে পাপ কাজ করে অথচ সে জানে না যে পাপকর্মটি তার ‘ত্বকদীরে’ আল্লাহ তাআলা লিখেছেন কি না। যেকোনো কাজ নিজ এখতিয়ার ও ক্ষমতাবলে সমাপ্ত করার পূর্ব পর্যন্ত কেউ জানতে পারে না যে সংশ্লিষ্ট কাজটি আল্লাহ তাআলা তার ‘ত্বকদীরে’ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন কি না।

وَمَا تَدْرِى نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا

“কেউ জানে না আগামীকাল সে কী কামাই করবে।” [সূরা লোকমান (৩১) : ৩৪]

তাহলে কোনো কাজ করা বা না-করার ক্ষেত্রে অপারগতা অথবা অক্ষমতার যুক্তি [অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে করতাম, না চাইলে করতাম না] দেখানো কীভাবে সঠিক হতে পারে? তাই আল্লাহ তাআলা এ ধরনের যুক্তি দেখানোর বিষয়টি বাতিল ঘোষণা করেছেনঃ

سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ لَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشْرَكْنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَىْءٍ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّىٰ ذَاقُوا۟ بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَآ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ

“মুশরিক লোকেরা অচিরেই একথা বলবে, যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা শিরক করতাম না। আমাদের বাপ-দাদারাও শিরক করত না। আর আমরা কোনো জিনিসকে হারাম করতাম না। বস্তুত এ ধরনের কথা বলে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা সত্যে মিথ্যারোপ করেছিল। এদের বলো, তোমাদের কাছে এমন কোনো জ্ঞান আছে কি, যা আমাদের সামনে পেশ করার মতো? তোমরা তো কেবল ধারণা আর অনুমানের ওপর চলো। আর ভিত্তিহীন ধারণার জন্ম দিয়ে চলেছ।” [সূরা আনআম (০৬) : ১৪৮]

যে পাপী ব্যক্তি তাকদীরের দোহাই দেয়, তাকে আমরা বলতে চাই, আনুগত্য বা নেক কাজ করাকে আপনি আপনার তাকদীরের লিখন বলছেন না কেন। আল্লাহ তাআলা তো নেক কাজই আপনার তাকদীরে লিখে রেখেছেন। আপনার দ্বারা কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে পাপ-পুণ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, তাকদীরের লিখন তো আপনার অজানা। অর্থাৎ পাপ করে আপনি যেভাবে তাকদীরের লিখন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন, পুণ্য কাজ করেও তাকদীরের লিখন বলে চালিয়ে দিতে পারবেন। এ জন্যই সাহাবায়ে কিরামকে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই জান্নাত কিংবা জাহান্নামের স্ব-স্ব স্থান লিপিবদ্ধ রয়েছে তখন তাঁরা বললেন, আমরা কি তাহলে তাকদীরের ওপর ভরসা করে আমল বাদ দিয়ে দেবো? তিনি উত্তরে বললেন, বরং তোমরা আমল করতে থাকো। যার জন্য যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সে কাজ সহজ।

তাকদীরের দোহাই দিয়ে যে ব্যক্তি পাপকাজ করে তাকে আমরা বলতে চাই, আপনি যদি মক্কা শরীফ সফর করতে চান, আর সেখানে যাওয়ার জন্য যদি দুটি পথ থাকে, আর একজন সত্যবাদী সংবাদদাতা আপনাকে জানাল যে, মক্কার একটি পথ খুবই বিপজ্জনক ও দুর্গম, আর একটি পথ সোজা এবং নিরাপদ, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই দ্বিতীয় পথটি অবলম্বন করবেন। প্রথম পথটি অবলম্বন করা আপনার জন্য আদৌ ঠিক নয়। কিন্তু প্রথম পথটি অবলম্বন করে যদি আপনি একথা বলেন, আমার তাকদীরে এটাই লিখা ছিল তাহলে অবশ্যই লোকেরা আপনাকে পাগল বলে গণ্য করবে।

আমরা আরও বলতে চাই, আপনার কাছে যদি এমন দুটি চাকরির প্রস্তাব পেশ করা হয় যার একটি হচ্ছে অধিক বেতনের (অপরটি স্বল্প বেতনের) তাহলে আপনি বেশি বেতনের চাকরিটাই গ্রহণ করবেন। তাহলে আখেরাতের আমলের ক্ষেত্রে আপনি কীভাবে নিম্নমানের কাজ করাকে বেছে নেবেন? তারপর বলবেন এটাই তাকদীরের লিখন?

তাকে আরও বলতে চাই, আমরা দেখতে পাই আপনার যখন কোনো শারীরিক রোগ দেখা দেয়, তখন চিকিৎসার জন্য আপনি সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ডাক্তারের দরজায় ধরনা দেন। তারপর অপারেশনের যত ব্যথা তা সহ্য করেন। ওষুধ খাওয়ার যাবতীয় ঝামেলাকে বরদাস্ত করেন। তাহলে অসংখ্য গুনাহর দ্বারা আপনার অন্তরে যে রোগের উৎপত্তি হয়েছে তা থেকে মুক্তিলাভের জন্য কেন আপনি সে রকমটি করেন না?

আমরা ঈমান আনি যে, বান্দাদের প্রতি আল্লাহর অপরিসীম রহমত ও পূর্ণ হিকমতের কারণে কোনো খারাপ কাজকেই আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত করা যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

والشر ليسإليك

“খারাপ তোমার দিকে বর্তাবে না।”

আল্লাহর ফায়সালা নিজে কখনো খারাপ হতে পারে না। কেননা, ফায়সালাটির পেছনে কোনো না-কোনো কল্যাণ ও হিকমত নিহিত আছে। অনিষ্ট বা ত্রুটি মূলত আল্লাহর ফায়সালার নয়; বরং ফায়সালাকৃত জিনিস বা বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ত। এর প্রমাণ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীঃ

وقني شر ما قضيت

“হে আল্লাহ, তোমার ফায়সালাকৃত জিনিসের অনিষ্ট হতে আমাকে বাঁচাও।” [আবু দাউদ]

এ বাক্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দুআয়ে কুনুতের অংশ হিসেবে শিখিয়েছেন।

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনিষ্ট কথাটি আল্লাহ তাআলার ফায়সালাকৃত জিনিসের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তাই অনিষ্ট বা দোষ মূলত ফায়সালাকৃত বিষয়ের। তবে নিছক অনিষ্টই এর মূল কথা নয়। এক দিক থেকে খারাপ হলেও আবার অপর দিক থেকে এর মধ্যে কোনো না-কোনো কল্যাণ নিহিত আছে।

দুনিয়ার বিপর্যয়, যেমনঃ দুর্ভিক্ষ, রোগ-ব্যাধি, অভাব-অনটন, ভয়-ভীতি ও আতঙ্ক ইত্যাদি খারাপ বটে, কিন্তু অন্য দিক থেকে বিচার করলে এগুলোর মধ্যেও কল্যাণ খুঁজে পাওয়া যাবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেনঃ

ظَهَرَ ٱلْفَسَادُ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ ٱلَّذِى عَمِلُوا۟ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

“লাোকদের নিজেদের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। যেন তাদের নিজেদের কৃতকর্মের স্বাদ ভোগ করাতে পারেন। এর ফলে হয়তো তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসবে।” [সূরা রূম (৩০) : ৪১]

চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীর রজম অর্থাৎ পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেয়া, চোর এবং ব্যভিচারীর নিজের জন্য অনিষ্টকর হতে পারে। কেননা, চোর তার হাত হারাচ্ছে আর ব্যভিচারী তার জীবন হারাচ্ছে। কিন্তু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে এর মধ্যেও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর তা হচ্ছে, তাদের উভয়ের পাপের কাফফারা হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি একত্র করা হবে। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে এর আরও একটি কল্যাণকর দিক রয়েছে। তা হচ্ছে, এ বিধান প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের ধন-সম্পদ, মান-ইজ্জত এবং বংশ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

“ঈমান বিল কদার” বা তাকদীরের প্রতি ঈমান স্থাপন করার কারণে মানুষের কর্মসমূহের ওপর তার ইচ্ছা ও ক্ষমতার বিষয়টি সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, শরীআত ও বাস্তব অবস্থা বান্দার নিজস্ব যে ইচ্ছাশক্তি রয়েছে তা সাব্যস্ত করে।

১। শরীয়াতের প্রমাণঃ

আল্লাহ তাআলা বান্দার ইচ্ছাপ্রসঙ্গে বলেন,

ذَٰلِكَ ٱلْيَوْمُ ٱلْحَقُّ فَمَن شَآءَ ٱتَّخَذَ إِلَىٰ رَبِّهِۦ مَـَٔابًا

“এই দিবস সত্য। সুতরাং যার ইচ্ছা সে তার রবের নিকট তার ঠিকানা তৈরি করুক।” [সূরা আন-নাবা (৭৮) : ৩৯]

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

فَأْتُوا۟ حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ

“অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে (স্ত্রীদের কাছে) যেভাবে ইচ্ছা গমন করো।” [সূরা আল-বাকারা (০২) : ২২৩]

আল্লাহ তাআলা বান্দার সামর্থ্য সম্পর্কে আরও বলেন,

فَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُمْ

“অতএব তোমরা আল্লাহর যথাসাধ্য তাকওয়া অবলম্বন করো।” [সূরা আত-তাগাবুন (৬৪) : ১৬]

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের দায়িত্ব দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার ওপর বর্তায় যা সে করে।” [সূরা আল-বাকারা (০২) : ২৮৬]

২। বাস্তবতার আলোকে এর প্রমাণঃ

প্রত্যেক মানুষ জানে যে, তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি ও সামর্থ্য রয়েছে এবং এরই মাধ্যমে সে কোনো কাজ করে বা তা থেকে বিরত থাকে। যেসব কাজ তার ইচ্ছায় সংঘটিত হয় যেমন চলাফেরা করা এবং যা তার অনিচ্ছায় হয়ে থাকে যেমন, হঠাৎ করে শরীর প্রকম্পিত হওয়া এ উভয় অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা সে পার্থক্যও করতে পারে।

তবে বান্দার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আল্লাহর ইচ্ছা ও সামর্থ্যের অধীন ও অনুগত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

لِمَن شَآءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ - وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ-

“যে সরল পথে চলার ইচ্ছা করে (এ ঘোষণা) তার জন্য, আর আল্লাহ রাবুল আলামীনের ইচ্ছার বাইরে তোমাদের কোনো ইচ্ছা কার্যকর হতে পারে না।” [সূরা আত-তাকভীর (৮১): ২৮-২৯]

যেহেতু সমগ্র বিশ্বজগৎ আল্লাহ তাআলার রাজত্ব, তাই তাঁর রাজত্বে তাঁর অজানা কিছু ঘটতে পারে না।

আমাদের উল্লিখিত বর্ণনানুযায়ী তাকদীরের ওপর বিশ্বাস বান্দাকে তার ওপর অর্পিত ওয়াজিব আদায় না করার অথবা তাকদীরের কথা বলে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কোনো সুযোগ প্রদান করে না। সুতরাং তাকদীরের ওপর বিশ্বাস করে এ ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করা কয়েকটি কারণে বাতিল বলে বিবেচিত হবে। তন্মধ্যে কয়েকটি প্রমাণ নিম্নে বর্ণনা করা হলোঃ

(এক)
আল্লাহ তাআলা বলেন,

سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ لَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشْرَكْنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَىْءٍ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّىٰ ذَاقُوا۟ بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَآ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ

“যারা শির্ক করছে তারা অচিরেই বলবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণ শির্ক করতাম না এবং না আমরা কোনো বস্তুকে হারাতাম। এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, শেষ পর্যন্ত তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছে। আপনি বলুন, তোমাদের কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে, যা আমাদের দেখাতে পারো? তোমরা শুধু আন্দাজের অনুসরণ করো এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বলো।” [সূরা আল-আনআম (০৬) : ১৪৮]

এতে বোঝা গেল, পাপকাজ করার জন্য তাকদীরকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা যদি বৈধ হতো তবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে শাস্তি দিতেন না।

(দুই)
আল্লাহ বলেন,

رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةٌۢ بَعْدَ ٱلرُّسُلِ وَكَانَ ٱللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا

“রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আন-নিসা (৪) :১৬৫]

যদি তাকদীর পথভ্রষ্ট লোকদের জন্য পাপকাজ করার প্রমাণ হতো তাহলে নবী-রাসূলগণ প্রেরিত হওয়ার পর এ প্রমাণকে উঠিয়ে নেওয়া হতো না। কেননা, নবী এবং রসূলগণের আগমনের পরেও অবাধ্যতা তাকদীরের কারণে সংঘটিত হচ্ছে।

(তিন)
আলী ইবন আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত আছে,

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোনো লোক নেই, যার ঠিকানা জান্নাতে বা জাহান্নামে লেখা হয়নি। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা কি ভাগ্যের ওপর তাওয়াক্কুল তথা ভরসা করে থাকব না? রাসূলুল্লাহ তদুত্তরে বললেন, না, আমল করতে থাকো, যাকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে তা সহজ পাবে।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাঠ করলেনঃ

فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَٱتَّقَىٰ - وَصَدَّقَ بِٱلْحُسْنَىٰ - فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْيُسْرَىٰ

“আর যে দান করে, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যা উত্তম তা সত্য বলে মেনে চলে, আমরা তার জন্য সুগম করে দেবো সহজ পথ।” [সূরা আল-লাইল (৯২) : ৫-৭]

সহীহ মুসলিমের হাদীসে এভাবে এসেছে যে,

‏ "‏اعملوا فكل ميسر لما خلق له‏"

“যে যার জন্য সৃষ্ট তা তার জন্য সহজ।”

তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকদীরের ওপর ভর করে থাকতে নিষেধ করেছেন।

(চার)
আল্লাহ তা’আলা বান্দাকে কতিপয় বিষয়ের আদেশ এবং কতিপয় বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন। তাকে তার ক্ষমতা ও সাধ্যের বাইরে কিছুই করতে বলেননি।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُمْ

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো।” [সূরা আত-তাগাবুন (৬৪) : ১৬]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা (৩২) : ২৮৬]

যদি বান্দা কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে বাধ্যই থাকত, তাহলে তাকে তার সাধ্য ও ক্ষমতার বহির্ভূত এমন কাজের নির্দেশ দেওয়া হতো যা থেকে তার রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় থাকত না। আর সেটা বাতেল। তাই বান্দা ভুল, অজ্ঞতাবশত অথবা জোরপূর্বক অনিচ্ছাকৃত কোনো অপরাধ করলে তাতে তার পাপ হয় না।

(পাঁচ)
আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদীর সম্পর্কে বান্দার কোনো জ্ঞান নেই। তা গায়েবী জগতের এক গোপন রহস্য। তাকদীরের বিষয় সংঘটিত হওয়ার পরই কেবল বান্দা তা জানতে পারে। বান্দার ইচ্ছা তার কাজের পূর্বে হয়ে থাকে; তাই তার ইচ্ছা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদীর জানার ওপর ভিত্তি করে হয় না। এমতাবস্থায় তাকদীরের দোহাই দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আর যে বিষয় বান্দার জানা নেই সে বিষয়ে তার জন্য প্রমাণ হতে পারে না।

(ছয়)
আমরা লক্ষ করি, মানুষ পার্থিব বিষয়ে সদাসর্বদা যথোপযুক্ত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হয়ে থাকে। কখনো ক্ষতিকর ও অলাভজনক কাজে পা বাড়ায় না এবং তখন তাকদীরের দোহাইও দেয় না। তা হলে ধর্মীয় কাজে উপকারী দিক ছেড়ে দিয়ে ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়ে তাকদীরের দোহাই দেওয়া হয় কেন? ব্যাপারটা কি উভয় ক্ষেত্রে এক নয়?

প্রিয় পাঠক, আপনার সম্মুখে দুটি উদাহরণ পেশ করছি যা বিষয়টি স্পষ্ট করে দেবে, ইন শা আল্লাহঃ

প্রথম উদাহরণঃ

যদি কারও সামনে দুটি পথ থাকে। এক পথ তাকে এমন এক দেশে নিয়ে পৌঁছাবে যেখানে শুধু নৈরাজ্য, খুন-খারাবি, লুটপাট, ভয়-ভীতি ও দুর্ভিক্ষ বিরাজমান। দ্বিতীয় পথ তাকে এমন স্বপ্নের শহরে নিয়ে যাবে যেখানে শৃঙ্খলা-নিরাপত্তা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিদ্যমান। এমতাবস্থায় সে কোন পথে চলবে? নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, সে দ্বিতীয় পথে চলবে। যে পথে শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা বলবৎ রয়েছে। কোনো বুদ্ধিমান লোক প্রথম পথে পা দিয়ে ভাগ্যের দোহাই দেবে না। তাহলে মানুষ আখিরাতের ব্যাপারে জান্নাতের পথ ছেড়ে জাহান্নামের পথে চলে ক্বদরের দোহাই দেবে কেন?

দ্বিতীয় উদাহরণঃ

রোগীকে ওষুধ সেবন করতে বললে তা তিক্ত হলেও সে সেবন করে। বিশেষ ধরনের কোনো খাবার খেতে নিষেধ করা হলে তা সে খায় না, যদিও তার মন খেতে চায়। এসব শুধু নিরাময় ও রোগমুক্তির আশায় এবং সে তাকদীরের দোহাই দিয়ে ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকে না বা নিষিদ্ধ খাদ্য ভক্ষণ করে না।

তাহলে মানুষ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলি বর্জন এবং নিষেধাবলি অমান্য করে ত্বাকদীরের দোহাই দেবে কেন?

(সাত)
যে ব্যক্তি তার ওপর অর্পিত ওয়াজিব কাজসমূহ ত্যাগ করে অথবা পাপকাজ করে তাকদীরের দোহাই দিয়ে থাকে অথচ তার ধন-সম্পদ বা মান-সম্মানে কেউ যদি আঘাত হেনে বলে, এটাই তোমার তাকদীরে লেখা ছিল, আমাকে দোষারোপ কোরো না, তখন সে তার যুক্তি গ্রহণ করবে না। তাহলে কেমন করে সে তার ওপর অন্যের আক্রমণের সময় তাকদীরের দোহাই স্বীকার করে না। তাহলে কেন সে আল্লাহর অধিকারে আঘাত হেনে তাকদীরের দোহাই দেবে?

উল্লেখ্য, একদা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দরবারে এক চোরকে হাজির করা হয়। তার হাত কর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলে সে বলে, হে আমিরুল মুমিনীন, থামুন, আল্লাহ তাক্বদীরে লিখে রেখেছেন বলে আমি চুরি করেছি। উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমরাও আল্লাহ তাকদীরে লিখে রেখেছেন বলে হাত কর্তনের নির্দেশ দিয়েছি।

তাকদীরের ওপর ঈমানের বহুবিধ ফল রয়েছে তন্মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলোঃ

১. ঈমান বিল ক্বাদর দ্বারা উপায়-উপকরণ গ্রহণকালে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল ও ভরসার সৃষ্টি হয় এবং সে তখন শুধু উপায়-উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয় না। কেননা, প্রতিটি বস্তুই আল্লাহ তাআলার তাকদীরের আওতাধীন।

২। ব্যক্তির কোনো উদ্দেশ্য সাধিত হলে সে তখন নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে কারণ, যা অর্জিত হয়েছে তা সবই আল্লাহর নেআমত। যা তিনি কল্যাণ ও সাফল্যের উপকরণ দ্বারা নির্ধারণ করে রেখেছেন। আর ব্যক্তি নিজ কর্মের জন্য আত্মম্ভরি হলে এই নি’আমতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে ভুলে যায়।

৩। ঈমান বিল ক্বাদর দ্বারা বান্দার ওপর আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী যা কার্যকর হয় তাতে তার অন্তরে প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা অর্জিত হয়। ফলে সে কোনো প্রিয় বস্তু হারালে বা কোনো প্রকার কষ্ট ও বিপদাপদে পতিত হলে বিচলিত হয় না। কারণ, সে জানে, সবকিছুই সেই আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী ঘটছে যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর মালিক। যা ঘটবার তা ঘটবেই।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِى ٱلْأَرْضِ وَلَا فِىٓ أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِى كِتَٰبٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَآ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٌ - لِّكَيْلَا تَأْسَوْا۟ عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا۟ بِمَآ ءَاتَىٰكُمْ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর যেসব বিপদাপদ আসে, সৃষ্টির পূর্বেই তা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা যা হারিয়ে ফেলো তজ্জন্য দুঃখিত না হও এবং তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, সেজন্য উল্লসিত না হয়ে ওঠো। আল্লাহ কোনো উদ্ধত-অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আল-হাদীদ (৫৭) : ২২-২৩]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“মুমিনের ব্যাপারে আশ্চর্য হতে হয়, তার সব ব্যাপারেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। একমাত্র মুমিনের ব্যাপারেই তা হয়ে থাকে। আনন্দের কিছু হলে সে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তখন তা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর যখন তার ওপর কোনো ক্ষতিকর বিষয় আপতিত হয় তখন সে ধৈর্যধারণ করে, তখন তার জন্য তাও কল্যাণকর হয়ে ওঠে।” [সহীহ মুসলিম]

তাকদীর সম্পর্কে দুটি সম্প্রদায় পথভ্রষ্ট হয়েছেঃ

তন্মধ্যে একটি হলো জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়, এরা বলে, বান্দা তাকদীরের কারণে স্বীয় ক্রিয়া-কর্মে বাধ্য, এতে তার নিজস্ব কোনো ইচ্ছাশক্তি বা সামর্থ্য নেই।

আর দ্বিতীয়টি হলো ক্বাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়, এদের বক্তব্য হলো, বান্দা তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডে স্বীয় ইচ্ছা ও শক্তির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পন্ন, তার কাজে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা বা কুদরতের কোনো প্রভাব নেই।

শরী’আত ও বাস্তবতার আলোকে প্রথম দল (জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়)-এর বক্তব্যের জবাবঃ

১. শরীআতের আলোকে এর জবাবঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য ইরাদা ও ইচ্ছাশক্তি সাব্যস্ত করেছেন এবং বান্দার প্রতি তার কার্যক্রমের সম্বন্ধও আরোপ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

مِنكُم مَّن يُرِيدُ ٱلدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ ٱلْءَاخِرَةَ

“তোমাদের কারও কাম্য হয় দুনিয়া আবার কারও কাম্য হয় আখেরাত।” [সূরা আলে ইমরান (০৩) :১৫২]

আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

وَقُلِ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَن شَآءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَآءَ فَلْيَكْفُرْ إِنَّآ أَعْتَدْنَا لِلظَّٰلِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا

“বলো, সত্য তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত। অতএব যার ইচ্ছা বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা কুফুরী করুক আমি যালিমদের জন্য অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি। যার বেষ্টনী তাদের পরিবেষ্টিত করে রাখবে।” [সূরা আল-কাহাফ (১৮): ২৯]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

مَّنْ عَمِلَ صَٰلِحًا فَلِنَفْسِهِۦ وَمَنْ أَسَآءَ فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّٰمٍ لِّلْعَبِيدِ

“যে সৎকর্ম করে সে নিজের জন্যই করে আর যে অসৎকর্ম করে, তা তারই ওপর বর্তাবে। আপনার পালনকর্তা বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুম করেন না।” [সূরা ফুসসিলাত / সূরা হা-মীম সেজদাহ্‌ (৪১): ৪৬]

২. বাস্তবতার আলোকে এর জবাবঃ সকল মানুষেরই জানা আছে যে, তার কিছু কর্ম তার স্বীয় ইচ্ছাধীন, যা তার আপন ইচ্ছায় সম্পাদিত করে। যেমনঃ খাওয়া-দাওয়া, পান করা এবং ক্রয়-বিক্রয় করা। আর কিছু কাজ তার অনিচ্ছাধীন। যেমনঃ অসুস্থতার কারণে শরীর কম্পন করা ও উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে পড়ে যাওয়া। প্রথম ধরনের কাজে মানুষ নিজেই কর্তা, নিজ ইচ্ছায় সে তা গ্রহণ করেছে এতে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আর দ্বিতীয় প্রকার কাজকর্মে তার কোনো নিজস্ব পছন্দ ছিল না এবং তার ওপর যা পতিত হয়েছে তার কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না।

শরীআত ও যুক্তির আলোকে দ্বিতীয় দল ক্বাদারিয়্যাহদের বক্তব্যের জবাবঃ

শরী’আতঃ আল্লাহ তাআলা সকল বস্তুর স্রষ্টা, জগতের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় অস্তিত্ব লাভ করে। আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, বান্দাদের সব কর্মকাণ্ডও আল্লাহর ইচ্ছায় বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقْتَتَلَ ٱلَّذِينَ مِنۢ بَعْدِهِم مِّنۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ ٱلْبَيِّنَٰتُ وَلَٰكِنِ ٱخْتَلَفُوا۟ فَمِنْهُم مَّنْ ءَامَنَ وَمِنْهُم مَّن كَفَرَ وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقْتَتَلُوا۟ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ

“আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি এসে যাবার পর তাঁদের পয়গম্বরদের পরবর্তীরা পরস্পর লড়াই-বিগ্রহে লিপ্ত হতো না। কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরাোধ সৃষ্টি হয়ে গেল। অতঃপর তাদের কেউ তো ঈমান এনেছে, আর কেউ হয়েছে কাফের। আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে তারা পরস্পর লড়াই করত না। কিন্তু আল্লাহ তা-ই করেন, যা তিনি ইচ্ছা করেন।” [সূরা আল-বাকারা (০২) : ২৫৩]

আল্লাহ আরও বলেন,

وَلَوْ شِئْنَا لَءَاتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَىٰهَا وَلَٰكِنْ حَقَّ ٱلْقَوْلُ مِنِّى لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ ٱلْجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ أَجْمَعِينَ

“আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতাম। কিন্তু আমার এ উক্তি অবধারিত সত্য, আমি জ্বীন ও মানব উভয় দ্বারা অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।” [সূরা আস-সাজদাহ (৪১) : ১৩]

যুক্তির মাধ্যমে এর জবাবঃ একথা নিশ্চিত যে, সমগ্র বিশ্বজগৎ আল্লাহর মালিকানাধীন এবং মানুষ এই বিশ্বজগতেরই একটি অংশ, তাই সেও আল্লাহর মালিকানাধীন। আর মালিকানাধীন কোনো সত্তার পক্ষে মালিকের অনুমতি ও ইচ্ছা ব্যতিরেকে তার রাজত্বে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।