মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ১০/১৩

(১০) প্রকৃতি বিষয়ক

প্রকৃতি বিষয়কঃ

আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর সত্যের সন্ধান বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন ‘প্রকৃতি বিষয়ক’। খুব সংক্ষিপ্ত এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেব কিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে কিছু কিছু হিন্দুধর্মের পৌরাণিক এবং খ্রিষ্টধর্মের ধর্মীয় কিতাবাদির ওপর। যেহেতু আমি একজন মুসলিম এবং হিন্দুধর্ম ও খ্রিষ্টধর্ম আমার আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, তাই আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দরকার মনে করিনি।

‘প্রকৃতি’ বিষয়ক অধ্যায়ের প্রথম প্রশ্নটি ছিল—

‘মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য কেন?’

অধ্যায়টির অবতারণা করতে গিয়ে আরজ আলী সাহেব তিন লাইনে দুটি ভুল তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,

“পবিত্র মক্কার মাটি দ্বারা বেহেস্তের মধ্যে আদমের মূর্তি গঠিত হয়”।

অথচ কুরআন এবং হাদীসের কোথাও এর কোনোরূপ প্রমাণ পাওয়া যায় না যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আদম আলাইহিস সালামকে মক্কা শরীফের মাটি থেকেই সৃষ্টি করেছেন। কুরআনে আদম আলাইহিস সালাম এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে অনেকগুলো আয়াত আছে। যেমনঃ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ঈসার সাদৃশ্য হচ্ছে আদমের মতোই। তাকে তিনি কাদামাটি থেকে সৃষ্টি করেন”। [সূরা আলে ইমরান (০৩) : ৫৯]

সহীহ বুখারীর হাদীসে বলা আছে,

আবু মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাপ্ত মাটি দ্বারাই আদমকে সৃষ্টি করা হয়। তাই আদমের সন্তানেরা ঠিক মাটির অনুপাতে কেউ (দেখতে) সাদা, কেউ গৌরবর্ণ, কেউ কালো এবং কেউ হয় মাঝামাঝি রকমের”। [তিরমিযী, হাদিস নং : ২৯৫৫]

উপরিউক্ত হাদীস থেকে আদম আলাইহিস সালাম মক্কা শরীফের মাটি নয়; বরং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার মাটি থেকেই সৃষ্ট, এটাই প্রতীয়মান হয়। এই হাদীসের কোথাও কিন্তু আমরা স্পেসেফিক মক্কা শরীফের নাম দেখতে পাই না; বরং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের মাটি থেকেই যে আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্ট, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাই। তাহলে দেখা যাচ্ছে, অধ্যায়ের শুরুতেই আরজ আলী সাহেব এমন একটি তথ্য দিয়ে ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ শুরু করলেন, যা আদতে ইসলামের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়।

একই অধ্যায়ে আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন,

‘ধর্মযাজকগণ বলেন, জগতের যাবতীয় জীব নাকি একই সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল!’

প্রথমত, ইসলামধর্ম যে জিনিস দুটোর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে তা হলো কুরআন এবং সুন্নাহ। ইসলাম কোনো ধর্মযাজকের মুখের বুলির ওপর নির্ভর করে চলে না। একজন ধর্মজাযক কী বলেছেন বা বললেন তা কখনোই ইসলাম ধর্মের পক্ষে যুক্তি নয়। দেখতে হবে কুরআন এবং সুন্নাহর মধ্যে কী বলা আছে। পবিত্র কুরআন কিংবা হাদীসের কোথাও এমনটি বলা নেই যে, জগতের সকল প্রাণী একই সময়ে সৃষ্ট।

অধ্যায়ের শুরুতেই এ রকম দুটি ভুল তথ্য দিয়ে আরজ আলী সাহেব এগিয়েছেন। আমরা দেখব তিনি আরও কী রকম তথ্য আমাদের সামনে হাজির করেন।

মানুষ ও পশুতে সাদৃশ্য নিয়ে আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন,

“মানুষের রক্তের প্রধান উপাদান- শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকা, জল ও লবণ জাতীয় কিছু পদার্থ এবং দেহ বিশ্লেষণ করিলে পাওয়া যায়- লৌহ, কার্বন, ফসফরাস ও গন্ধকাদি জাতীয় কতিপয় মৌলিক পদার্থ। অন্যান্য জীবের রক্তের উপাদানও উহাই কেন?”

মজার প্রশ্ন বটে! মানুষ এবং প্রাণীদের শরীরের গাঠনিক উপাদান এক হওয়াটা কেনই-বা ধর্মকে একহাত নেওয়া টাইপ প্রশ্নের মধ্যে পড়ল বুঝলাম না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, সকল প্রাণীর গাঠনিক উপাদান একই। তিনি বলেন,

“প্রাণসম্পন্ন সবকিছুকে আমি পানি থেকেই সৃষ্টি করেছি”। [সূরা আল আম্বিয়া (২১) : ৩০]

লক্ষ করুন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, প্রাণ আছে এমন সবকিছুকেই তিনি পানি থেকেই সৃষ্টি করেছেন। মানুষের প্রাণ আছে। জীবজন্তুরও প্রাণ আছে। তাহলে উভয়েই প্রাণী। এখন উভয়েই প্রাণী হলে, কুরআনমতে উভয়ের সৃষ্ট উপাদান একই। সেটি হলো পানি। তাহলে যাদের কোষের মৌলিক উপাদানটাই এক, তাদের অন্যান্য গাঠনিক উপাদানও একই হবে, এতে আশ্চর্য হবার কিংবা প্রশ্ন তোলার কিছু আদৌ আছে কি?

পবিত্র কুরআন আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে যে মানুষ এবং প্রাণী পানি থেকেই সৃষ্ট। যেমনঃ

“তিনিই আল্লাহ যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে”। [সূরা আল ফুরকান (২৫) : ৫৪]

আবার বলা হচ্ছে,

“এবং আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীকে পানি থেকেই সৃষ্টি করেছেন”। [সূরা আন নূর ২৪ : ৪৫]

তাহলে দেখা যাচ্ছে, কুরআনের ভাষ্যমতেই মানুষ এবং প্রাণীদের শরীরের একেবারে গাঠনিক উপাদান এক। সেটা হলো পানি। আর গাঠনিক উপাদান যেখানে একই, সেখানে অন্যান্য উপাদানও একই হবে, এটাই স্বাভাবিক।

একটি ছোট্ট উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটা বোঝা যাক। ধরুন একজন ইঞ্জিনিয়ারকে পাশাপাশি দুটি বাড়ি বানাতে দেওয়া হলো। ইঞ্জিনিয়ার কি একই রকম, একই স্টাইলে, একই ডিজাইনে বাড়ি দুটি বানাবেন? নিশ্চয়ই না। তিনি দুটি ভিন্ন আকার, আকৃতি, ডিজাইনে বাড়ি দুটি বানাবেন। এখন একই ইঞ্জিনিয়ারের বানানো বাড়ি দুটি দেখে কেউ যদি প্রশ্ন করে, “আরে আরে! এই বাড়িতে ইট ব্যবহার করেছেন, ওই বাড়িতেও ইট কেন? এই বাড়িতে সিমেন্ট, রড ব্যবহার করেছেন, ওই বাড়িতেও একই জিনিস কেন ব্যবহার করেছেন? ভিন্ন কিছু ব্যবহার করলেন না কেন?”

পাঠক, আপনার কমনসেন্স কী বলে? প্রশ্নটি কি আদৌ যৌক্তিক? আপনার কাছে এই প্রশ্নটিকে যদি যৌক্তিক মনে না হয়, তাহলে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নটা কতটুকু যৌক্তিক ভাবুন তো! যে সকল জীববিজ্ঞানীরা নিজেদের বিবর্তনবাদী বলে পরিচয় দেয়, তাদের কেউই কখনোই এই প্রশ্নটা উত্থাপন করেনি যে, “স্রষ্টা যদি থাকবেনই, তাহলে প্রাণী আর মানুষের গাঠনিক উপাদান এক কেন?” তারা এই প্রশ্নটা করেনি বা করে না এ জন্যই, কারণ এই প্রশ্নটা আদৌ প্রশ্ন হবার যোগ্যতাই রাখে না।

এটা তো গেল মানুষ এবং পশু বা প্রাণীর শরীরের মধ্যকার গাঠনিক উপাদান নিয়ে আরজ আলী সাহেবের বিভ্রান্তিমূলক যুক্তি। এর একটু পরে তিনি “আকাশ কী” শিরোনামে লিখেছেন,

‘আকাশ বলিতে সাধারণত শূন্যস্থান বুঝায়’।

আরজ আলী সাহেবের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে বলতে চাই, বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবিষয়ক কোনো ব্যাপারেই উনার সঠিক কোনো জানাশোনা ছিল না। এ জন্যই উনি নানান সময়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাপারগুলোকে নিজের মতো করে বুঝেছেন এবং সে বুঝ অনুসারে যুক্তি সাজিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আকাশ বলিতে সাধারণত শূন্যস্থান বুঝায়”। কিন্তু, আকাশ বলতে কখনোই শূন্যস্থান বোঝায় না। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করে বা এই সম্পর্কে ধারণা রাখে এমন যে কেউ জানেন, আকাশ মানে কখনোই ‘শূন্যস্থান’ নয়। উইকিপিডিয়াতে ‘Sky’ বা ‘আকাশ’ সম্পর্কে বলা আছে,

“The sky (or celestial dome) is everything that lies above the surface of the Earth, including the atmosphere and outer space.”
অর্থাৎ আকাশ হচ্ছে এমন কিছু যা আমাদের পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে অবস্থিত। আরও একটু আগালে উইকিপিডিয়া আরও জানাচ্ছে,

“In the field of astronomy, the sky is also called the celestial sphere. This is viewed from Earth’s surface as an abstract dome on which the Sun, stars, planets, and Moon appear to be traveling”
অর্থাৎ সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সবকিছুকে নিয়েই হচ্ছে আকাশ।

এমতাবস্থায়, আমরা যদি আরজ আলী সাহেবের মতো ধরে নিই যে, আকাশ মানে শূন্যস্থান, তাহলে এসব গ্রহ, নক্ষত্রাদি, যা আকাশেরই অংশ, সেসবও কি শূন্য বা শূন্যস্থান? নাহ। সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি মিলে যদি আকাশ হয়, তাহলে আকাশ কখনোই শূন্যস্থান বলে কিছু নয়। আর বর্তমান দুনিয়ার বাঘা বাঘা পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রায়ই একটি সুন্দর বুলি আওড়িয়ে থাকেন। সেটা হচ্ছে, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না বলেই প্রকৃতি কখনোই কোনো কিছু শূন্য রাখে না। এমতাবস্থায়, প্রকৃতিরই অংশ ‘আকাশ’ কীভাবে শূন্য হতে পারে?

এরপরেই আরজ আলী সাহেব লিখেছেন,

“কেহ কেহ সপ্তাকাশকে পদার্থের তৈয়ারি বলিয়া মনে করেন। তাহারা বলেন যে আকাশ প্রথমটি জলের, দ্বিতীয় লৌহের, তৃতীয় তাম্রের, চতুর্থ স্বর্ণের তৈয়ারি। উহারা আরও বলেন যে, ছাদে ঝুলান আলোর মতো চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি আকাশে ঝুলান আছে”।

প্রথমত, ইসলামের কোথাও কোন আকাশ কোন পদার্থের তৈরি তা নির্ধারণ করে বলা হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্রাদি ইত্যাদিকে যদি আকাশের অন্তর্ভূক্ত বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে বলতে হয় যে আকাশ অবশ্যই কোনো নির্দিষ্ট পদার্থের তৈরি। কারণ, গ্রহ, নক্ষত্রগুলো বিভিন্ন রকম পদার্থ যেমনঃ পাথর, কপার, পটাশিয়াম, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি দ্বারা তৈরি।

এরপর আরজ আলী সাহেব প্রথম আকাশ জলের, দ্বিতীয় আকাশ লোহার, তৃতীয় আকাশ তাম্রের, চতুর্থ আকাশ স্বর্ণের বলে যে মতবাদ ধর্মের বলে ব্যক্ত করেছেন, তার সাথে ইসলামের, অর্থাৎ কুরআন এবং হাদীসের ছিটেফোঁটা সম্পর্কও নেই। এগুলো তাঁর এলাকার কোনো পুথি বা ওয়াজের বাণী হলে হতে পারে, সেটার সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই।

একই অভিযোগের শেষে আরজ আলী সাহেব বলেছেন, ধর্মে নাকি বলা হয়েছে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি আকাশে ঝুলানো আছে। এই অভিযোগটি পুরোপুরিই মিথ্যা। অন্যান্য ধর্মের ব্যাপারে জানা নেই, ইসলামধর্মের কোথাও উল্লেখ নেই যে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি আকাশে ঝুলানো আছে। বরং প্রাচীনকালের মানুষ যখন মনে করত যে সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদি গ্রহ, নক্ষত্র স্থির, ঠিক সে সময় বসে কুরআন একেবারে আধুনিক বিজ্ঞানের সুরেই কথা বলেছে সূর্য, চন্দ্রের ব্যাপারে। কুরআন বলেছে,

“সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনের নাগাল পাওয়া। প্রত্যেকে আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে”। [সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ৪০]

অধুনা আধুনিক বিজ্ঞানও আমাদের জানাচ্ছে, সূর্য, চাঁদসহ প্রত্যেকটি গ্রহ-নক্ষত্রের রয়েছে আলাদা আলাদা কক্ষপথ এবং এই কক্ষপথ ধরেই তারা আবর্তিত হয়। পবিত্র কোরআনুল কারীম সূর্য, চন্দ্রকে আকাশে ঝুলানো বলে উল্লেখ করেনি, তারা যে নিজেদের কক্ষপথে আবর্তিত, সেটাই উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু সূর্য অবশ্যই তার নিজের কক্ষপথের বাইরে যেতে পারে না। চাঁদও তার নিজের কক্ষপথের বাইরে যেতে পারে না। মোদ্দাকথা, কোনো গ্রহ-নক্ষত্রই তার নিজের কক্ষপথ ছেড়ে বাইরে আসতে পারে না। অর্থাৎ তারা তাদের নির্দিষ্ট একটা বিন্দু বা কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়। এখন তারা যেহেতু একই কেন্দ্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, নিজেদের জায়গা পরিবর্তন করে না, সেহেতু এই ব্যাপারটাকে যদি আরজ আলী সাহেব “আকাশে ঝুলানো” ধরে নিয়ে ধর্মের সমালোচনায় নেমে পড়েন, তাহলে এটা নেহাত তাঁর জ্ঞান, জানা বা বোঝার স্বল্পতা। ধর্মেরই-বা কী দোষ?

আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“কোনো কোনো ধর্মাচার্য বলিয়া থাকেন যে, আকাশ সাতটি। ইহা কী রূপে হয়? যাহা শূন্য তাহা সংখ্যা দ্বারা সূচিত হয় কী রূপে? যাহারা আকাশকে সংখ্যা দ্বারা বিভক্ত করেন, তাহারা কি আকাশ বলিতে গ্রহকে বুঝেন?”

প্রথমত, আমরা আগেই দেখিয়েছি, আকাশ বলতে কখনোই কোনো শূন্যস্থানকে বোঝায় না। তাহলে আরজ আলী সাহেবের বক্তব্য ‘যাহা শূন্য তাহা সংখ্যা দ্বারা সূচিত হয় কী রূপে’ এই কথাটি একটি ভুল কথা। ভুল তথ্য। আকাশ শূন্যজাতীয় কিছু নয়। যদি আকাশ শূন্যজাতীয় কিছু না হয়, তাহলে আরজ আলী সাহেবের যুক্তিকে উল্টিয়ে দিয়ে বলা যায় যে যেহেতু আকাশ শূন্যজাতীয় কিছু নয়, সেহেতু আকাশকে সংখ্যা দ্বারা সূচিত করা যাবে।

এখন, কুরআন ‘সাত আকাশ’ জাতীয় কোনো কিছুর কথা বলেছে কি না? হ্যাঁ, বলেছে। কুরআন বলছে,

“বস্তুত তিনিই তৈরি করেছেন সপ্তাকাশ…”। [সূরা আল বাকারা (০২) : ২৯]

আলোচ্য আয়াতের অর্থ আসমান সাতটি, আর তা-ই সত্যকথন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকেও আমরা অনুরূপ স্পষ্ট ভাষ্য পেয়ে থাকি। যতক্ষণ পর্যন্ত বিজ্ঞান আকাশের রহস্য ভেদ না করবে, আকাশের সঠিক সংখ্যা কুরআন ও হাদীসের বিপরীত সংখ্যার প্রমাণ করতে পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহয় দেওয়া সংখ্যা অস্বীকার করার পক্ষে আরজ আলী সাহেবদের কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করছি যে আকাশ সাতটি।

এখন আসুন, আসলেই অসংখ্য আকাশ আছে কি না? কুরআন থেকে আকাশের সংজ্ঞা এবং এর সম্পূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় না আসলে। আমরা ধরে নিই যে এসব গায়েবের ব্যাপার। এসব ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে, বর্তমান বিজ্ঞান Multi Universe নামে একটি থিওরির কথা আমাদের জানাচ্ছে। তাদের কথা অনুসারে, আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে, আমাদের মহাবিশ্বের মতো অসংখ্য মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্বের বাইরের সবকিছু যেহেতু আকাশের অন্তর্গত এ কথাটিও আমরা বলি না। তা ছাড়া Multi Universe মানে কি সেই অসংখ্য আকাশ বা অসংখ্য মহাবিশ্ব? সেটাও আমাদের কাছে প্রমাণিত কথা নয়। এসবই ধারণামাত্র। ধারণা করা কথাকে আমরা কুরআনের বাণীর মতো মহাসত্য বাণীর বিপরীতে দাঁড় করাতে পারি না। সুতরাং আমি এ কথা বলছি না যে কুরআনের ‘সপ্তাকাশ’ তথা ‘অসংখ্য আকাশ’ ধারণার সাথে বিজ্ঞানের ‘Multi Universe’ তত্ত্বের মিল রয়েছে। আমি শুধু এটুকু বলছি, বিজ্ঞানীদের দেওয়া আকাশের সংজ্ঞা অনুসারে ধরে নিয়ে আগালে দেখা যায়, অসংখ্য আকাশের অস্তিত্ব খোদ বিজ্ঞানমহলের আলোচ্য বিষয়। তাহলে আরজ আলী সাহেবরা বিজ্ঞান না জেনে, না বুঝে ধর্মকে সব সময় একহাত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন কেন?

এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেব ‘দিবা রাত্রির কারণ কী’, ‘পৃথিবী কিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত’ এবং ‘ভূমিকম্পের কারণ কী’ শিরোনামে তিনটি প্রশ্ন করেছেন।

প্রথম প্রশ্নে তিনি বলেছেন,

“কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে চতুর্থ আসমানে একখানা সোনার নৌকায় সূর্যকে রাখিয়া ৭০ হাজার ফেরেশতা সূর্যসহ নৌকাখানা টানিয়া পূর্ব দিক হইতে পশ্চিম দিকে লইয়া যায় ও সারা রাত আরশের নিচে বসিয়া আল্লাহর এবাদত করে এবং প্রাতে সূর্য পুনরায় পূর্ব দিকে হাজির হয়”।

দ্বিতীয় প্রশ্নে বলেছেন,

“কেহ কেহ বলেন পৃথিবী একটি বলদের শৃঙ্গের ওপরে আছে। কেহ বলেন, পৃথিবী একটি মাছের ওপরে এবং কেহ বলেন, পৃথিবী জলের ওপরে অবস্থিত। তাহাই যদি হয়, তবে সেই মাছ, বলদ, জল কীসের ওপরে অবস্থিত?”

তৃতীয় প্রশ্নে আরজ আলী সাহেব বলেছেন,

“কেহ কেহ বলেন যে, পৃথিবীধারী বলদ ভারাক্রান্ত হইয়া কখনও কখনও শৃঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করে এবং তাহার ফলে পৃথিবী কম্পিত হয়। যদি ইহাই হয়, তবে একই সময়ে পৃথিবীর সকল অঞ্চলে ভূমিকম্প হয় না কেন?”

বিজ্ঞ পাঠক, ওপরে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্ন তিনটি পড়ে নিশ্চই হাসছেন। আমার বুঝে আসে না, এ রকম কৌতুকময় জিনিসকে, যার সাথে ইসলামের ন্যূনতম কোনো সম্পর্কই নেই, সেসব বিষয়কে ইসলামের সাথে জুড়ে দিয়ে তিনি কীভাবে ইসলামের সমালোচনায় নামলেন? কোনো কিছুর সমালোচনা করার আগে তো সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানা লাগে। সেই বিষয়ের অথেনটিক সোর্স থেকে জেনে নিয়ে, এরপরে কোনো কিছু যদি সমালোচনা করার মতন হয়, তবেই না সমালোচনা করা যায়। সেসবের কোনো কিছুই না করে, কিছু পৌরাণিক মুখরোচক গালগল্পকে বিষয়বস্তু বানিয়ে বিশাল সাইজের বই লিখে ফেলা কি কোনো জ্ঞানী মানুষের কাজ?

আরজ আলী সাহেব এরপর আরও বলেছেন,

“কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, পৃথিবীধারী বলদ যখন শ্বাস ত্যাগ করে তখন জোয়ার হয় এবং যখন শ্বাস গ্রহণ করে, তখন ভাটা হয়। তাহাই যদি হয়, তাহলে পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই সময়ে জোয়ার বা ভাটা হয় না কেন?”

আরও একটি মজাদার প্রশ্ন। মানুষ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কিছুই জানত না, ঠিক তখন এ রকম কল্পকাহিনি বলে-শুনে তারা দিন পার করত। এমন নয় যে, এ সমস্ত কিছু ধর্মগ্রন্থের কথা। পবিত্র কোরআনুল কারীম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও এ ধরনের আজগুবি কিচ্ছা-কাহিনি পাওয়া যায় না। বরং কুরআনে পৃথিবী, আকাশ এবং মহাকাশ সম্পর্কিত এমন-সব তথ্য জানানো হয়েছে, যা হাল আমলের বিজ্ঞান আমাদের মাত্র সেদিন জানিয়েছে। পৌরাণিক কিচ্ছা-কাহিনি টেনে আরজ আলী সাহেবরা যেভাবে ধর্মের সমালোচনা করেছেন, তাতে আমরা বিবেকবান যে কেউই অবাক হতে বাধ্য।

“উত্তাপবিহীন অগ্নি কী রূপ” শিরোনামে আরজ আলী মাতুব্বর আরেকটি প্রশ্ন করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, “ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে যখন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি আগুনে পুড়লেন না কেন? এর কারণ কি এটাই যে তখন প্রকৃতির নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছিল যার ফলে আগুনের দাহ্যশক্তি লোপ পেয়েছে? অথবা অগ্নিকুণ্ডের মধ্যকার অক্সিজেন লোপ পেয়েছিল?”

প্রথমত, ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর একজন নবী ছিলেন। একজন দূত। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সেসব মনোনীত বান্দাদের অন্তর্গত, যাদের আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে হেদায়াতের পথ, সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে ডাকার জন্যই মনোনীত করেছেন। আল্লাহর এ সমস্ত বান্দাদের ওপর পৃথিবীতে নেমে এসেছিল নানান বিপদ, পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলো থেকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের রক্ষা করেছিলেন। এই পরীক্ষাগুলোও এসেছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। আবার রক্ষাও করেছিলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, তিনি যদি রক্ষা করবেনই, তাহলে পরীক্ষাটাই-বা কেন নিলেন?

উত্তর হচ্ছে, আল্লাহ পরীক্ষাটা এ জন্যই করেন যে, তিনি দেখতে চান তাঁর প্রিয় বান্দারা চরম বিপদের মুখে, দুর্যোগঘন মুহূর্তে কার ওপর ভরসা করে। তারা কি তাগুতের সাথে আপস করে, নাকি মাথা বাতিলের কাছে নত না করে শাস্তিকে বরণ করে নেয়। যখনই বান্দা তাঁর সেই ধৈর্যের পরীক্ষায় শতভাগ উন্নীত হয়ে যান, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দাকে তখন অন্য একটি উছিলা দিয়ে বাঁচিয়ে নেন।

এখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা অগ্নিকুণ্ডে আগুনের স্পর্শ থেকে রক্ষা করেছেন। নিরাপদ করেছেন। এটা আল্লাহর জন্য খুবই সোজা। এটি একটি মিরাকল। Miracle শব্দটিকে আরেকটি সুন্দর শব্দ দিয়ে বোঝানো যায়। সেটি হলো, Super Natural। Super Natural মানে হচ্ছে অতিপ্রাকৃত। অতিপ্রাকৃত অর্থ যে ঘটনাগুলো প্রকৃতিতে ঘটে, তার ব্যতিক্রম। যেমনঃ কেউ আগুনে হাত দিলে তার হাত পুড়ে যাবে। এখন আগুনে হাত দেওয়ার পরেও যদি কারও হাত না পোড়ে, তাহলে এই ঘটনা অতিপ্রাকৃত ঘটনা। ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর সাথে ঘটা ঘটনাটিও ঠিক সে রকম। অতিপ্রাকৃত। এটা আল্লাহর জন্য সহজ এ জন্যই যে আল্লাহ যখন কোনো কিছু করার ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।

ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে যখন নমরুদের রক্ষী বাহিনীরা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করছিল, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেই অগ্নিকে শান্ত অর্থাৎ আরামদায়ক ঠান্ডা হয়ে যেতে বলেন। আর তা শান্ত ও আরামদায়ক হয়ে যায়।

এ রকম মিরাকল যে কেবল ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এর সাথেই ঘটেছে তা নয়; আল্লাহ সুবাহান ওয়া’তালা ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম এর জন্য সাগরের পানির ওপরে রাস্তা তৈরি করেছিলেন যাতে তিনি ফেরাউনের বাহিনীর অলক্ষে চলে যেতে পারেন। ঈসা আলাইহিস সালামকে তিনি পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। এর প্রত্যেকটাই প্রকৃতির ব্যতিক্রম।

কেউ আগুনে হাত দিলে পুড়ে যাবে। ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করার পরও তাঁর কিছুই হয়নি, কারণ এটা ছিল মিরাকল।

কেউ সামুদ্রিক মাছের পেটে চলে গেলে বাঁচতে পারে না। কিন্তু ইউনুস আলাইহিস সালাম বেঁচেছিলেন। কারণ, এটা ছিল মিরাকল। কেউ পিতা ছাড়া জন্ম লাভ করতে পারে না। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালাম পিতা ছাড়াই জন্ম লাভ করেছেন। এটাই মিরাকল। সুপার ন্যাচারাল মানেই অতিপ্রাকৃত। যা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার বাইরে।

এখন যা কিছুই অতিপ্রাকৃত, অর্থাৎ প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে, সেগুলোকে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে বিভ্রান্তি ছড়ানোই স্বাভাবিক।

আপনি যখন একজন স্রষ্টাকে ধরে নিয়ে এই ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা জানতে চাইবেন, তখন আপনি কিন্তু আল্টিমেটলি ধরে নিচ্ছেন যে ‘স্রষ্টা’ বলে কেউ একজন আছে। এখন এরপরের প্রশ্ন, স্রষ্টা এ রকম ঘটনা কীভাবে ঘটান, তাই না? তাহলে আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, 'এসব প্রাকৃতিক নিয়মের সৃষ্টিকর্তা কে?'

-‘স্রষ্টা’।

-‘স্রষ্টা কি এসব নিয়মের অধীন?’

-‘না’।

-‘নিয়ম কি স্রষ্টার নিয়ন্ত্রক, নাকি স্রষ্টাই নিয়মের নিয়ন্ত্রক?’

-‘স্রষ্টাই নিয়মের নিয়ন্ত্রক’।

-‘তাহলে যিনি নিয়ন্ত্রক, তিনি কি চাইলে যেকোনো সময় তাঁর নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে পারেন না?’

-‘পারেন…’

-‘তাহলে এটা কি স্রষ্টার জন্য খুব কঠিন যে প্রকৃতির নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে অগ্নিকুণ্ড থেকে বাঁচিয়ে নেওয়া?’

ওপরের সমীকরণ আরও একবার পড়ে আসুন। যদি ওপরের সমীকরণ যৌক্তিক হয়, তাহলে এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ যে প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো।

এই অধ্যায়ে আরজ আলী সাহেবের একেবারে শেষ প্রশ্ন ছিল,

“নূহ আলাইহিস সালাম এর সময়কার মহাপ্লাবন কি পুরো পৃথিবী জুড়েই হয়েছিলো?”

এই প্রশ্নের অবতারণা করতে গিয়ে আরজ আলী সাহেব বেশ কিছু যুক্তি দেখিয়েছেন।। তিনি দেখিয়েছেন আদম আলাইহিস সালাম কত খ্রিষ্টপূর্ব সালে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। পৃথিবীতে আগমন করেই তিনি কোন উদ্যানে নেমেছিলেন। আদম আলাইহিস সালাম থেকে ঠিক কত বছর পরে নূহ আলাইহিস সালাম এসেছিলেন। এর ঠিক কত বছর পরে সেই মহাপ্লাবন হয়েছিল। মহাপ্লাবন থেকে বাঁচতে নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে যে নৌকা তৈরি করেছিলেন, সেই নৌকার আয়তন কত, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কত এসবও উল্লেখ করেছেন আরজ আলী সাহেব।

পাঠক, মজার ব্যাপার হলো, আরজ আলী সাহেব এই তথ্যগুলোর প্রত্যেকটাই নিয়েছেন খ্রিষ্টানদের বাইবেল থেকে। ইসলামিক অথেনটিক সোর্স, কুরআন, হাদীসের কোথাও এই কথাটি বলা নেই যে আদম আলাইহিস সালাম কত সালে পৃথিবীতে এসেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম কত সালে এসেছেন, মহাপ্লাবন কত সালে হয়েছে ইত্যাদি।

এখন, বাইবেলের হিসাব ধরে নিয়ে এসে কুরআন বা হাদীসকে আক্রমণ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কুরআন-হাদীস যেহেতু এ সমস্ত ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো টাইম ফ্রেমের উল্লেখ করেনি, সেহেতু ঠিক কত বছর বা কত বিলিয়ন বছর আগে আদম আলাইহিস সালাম এসেছিলেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আবার টাইম ফ্রেম উল্লেখ করে আরজ আলী সাহেব ধর্মীয় কিতাবাদির যে অসংগতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সেটা একান্তই বাইবেলের সাথে যায়, যেহেতু বাইবেল এসব ব্যাপারে নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেম উল্লেখ করে দিয়েছে। কুরআন যেহেতু সেটা করেনি, তাই এই যুক্তি দিয়ে কুরআনের সমালোচনা করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা নেই।

এখন নূহ আলাইহিস সালাম এর সময়কার সেই মহাপ্লাবন কি পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল?

আরজ আলী সাহেব এই জায়গায় বাইবেলের টাইম ফ্রেম ধরে দেখিয়েছেন, এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হওয়া সম্ভব না। কারণ, এই টাইম ফ্রেমেই যদি সেই মহাপ্লাবন হয়ে থাকে, তাহলে ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে দেখা যায়, ঠিক এই সময়টাতে পৃথিবীর আরও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সভ্যতা বহাল তবিয়তে বর্তমান ছিল। সেই মহাপ্লাবন সারা পৃথিবীব্যাপী হলে তো এসব সভ্যতা থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাহলে কি সারা দুনিয়াব্যাপী সেই মহাপ্লাবনের ঘটনা মিথ্যা?

এখানে প্রথমত যে জিনিসটা আমাদের স্মরণে রাখা উচিত তা হলো, নূহ আলাইহিস সালাম এর সময়কার সেই মহাপ্লাবন ঠিক কোন সময়টাতে হয়েছিল তার কোনো নির্দিষ্ট দিন, তারিখ কোনো কিছুই কুরআন-হাদীসে উল্লেখ নেই। যেহেতু এসবের কোনো ইঙ্গিত কুরআন-হাদীস দেয় না, সেহেতু বাইবেলের টাইম ফ্রেমে কুরআনকে বসিয়ে বিচার করাটা ভুল।

দ্বিতীয়ত, কুরআন কিন্তু স্পষ্ট করে কোথাও বলেনি যে এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল। কুরআন যেহেতু স্পষ্ট করে এটাও উল্লেখ করে না, তাই এই সমালোচনাটাও কুরআনের সাথে যায় না।

কিন্তু কোনো কোনো তাফসীরকারক বলেছেন যে এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছে।[তাফসীর ইবনে কাছির] অর্থাৎ এই মহাপ্লাবনে পুরো পৃথিবীই তলিয়ে গিয়েছিল। এখন যদি ধরেও নিই যে সেই মহাপ্লাবনে পুরো পৃথিবী তলিয়ে গিয়েছিল, তাতেও কোনো সমস্য নেই। কারণ, কুরআন তো নির্দিষ্ট করে বলছে না যে অমুক সালে নূহের প্লাবন হয়েছে। যেহেতু কুরআন সেটা বলছে না, তাই হতে পারে এই মহাপ্লাবন এমন সময়ে হয়েছিল, যখন সভ্যতা আর অবশিষ্ট থাকেনি। বাইবেলের টাইম ফ্রেম ধরে আগালে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদির সাথে যে দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে, কুরআনের বর্ণনায় সেটা নেই। কারণ, কুরআন নির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করেনি।

সুতরাং,

১) বাইবেলের টাইম ফ্রেম দিয়ে কুরআনকে বিচার করাটা অযৌক্তিক।
২) কুরআন স্পষ্ট উল্লেখ করে না যে এই মহাপ্লাবন পৃথিবীর সর্বত্র হয়েছিল।
৩) যদি হয়েও থাকে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ, কুরআন নির্দিষ্ট টাইম পিরিয়ডের কথা উল্লেখ করেনি। হতে পারে এটা মিলিয়ন বা বিলিয়ন বছর আগের ঘটনা। এবং আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।

আরজ আলী সাহেবরা করেছেন কী, ধর্মের নামে প্রচলিত নানান রকম কুসংস্কার, বিভিন্ন ধর্মে প্রচলিত নানান রীতি-নীতিকে ইসলাম এবং দ্বীনে ইসলাম ভেবে সমালোচনায় নেমে পড়েছিলেন। আফসোস! তারা এমন কোনো কিছু বা এমন কারও কাছে যায় না, যারা সত্য ইসলাম জানে এবং সঠিক ইসলাম মানে।