আরজ আলী সমীপে - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ৮/১৩
(০৮) পরকাল বিষয়ক
পরকাল বিষয়কঃ
‘পরকাল’ বিষয়ে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করার আগে একটি বিষয় বলা জরুরি মনে করছি। উনার প্রশ্নগুলোকে হুবহু উল্লেখ করে কলেবর বৃদ্ধি না করে এখন থেকে আমরা উনার প্রশ্নের মূল পয়েন্ট নিয়ে আগাব, ইনশাআল্লাহ। এই অধ্যায়ের শুরুতেই আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন করেছেন, “জীব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?”
তিনি বলেছেন,
‘মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য যদি হয় আল্লাহর নাম ও গুণকীর্তন করা, তাহলে জীব সৃষ্টির কারণ কী?’
আরজ আলী সাহেব ঠিক বলেছেন। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদাত করা। আর অন্যান্য সবকিছুকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের জন্য। যেমন : কুরআণ ঘোষণা দেয়,
“পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন”।[সূরা আল বাকারা (০২) : ২৯]
তাহলে মানুষ সৃষ্টির পাশাপাশি জীবজগৎ কেন সৃষ্টি করা হয়েছে তা কুরআন সুষ্পষ্টরূপে জানিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ তোলার আর কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না। প্রশ্ন তোলার আগে আরজ আলী সাহেব কুরআনটাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখলেই উত্তর পেয়ে যেতেন বলে মনে করি। এ ছাড়াও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য জীবজগতের রয়েছে ব্যাপক অবদান। “খাদ্যশৃঙ্খল” নামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবজগৎ থেকে উদ্ভিদজগৎ সবার রয়েছে কোনো না কোনো অবদান। প্রকৃতির সকল জীবজগৎ এবং উদ্ভিদজগৎ কোনো না-কোনোভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং প্রকৃতিতে মানুষ এবং জীবজগতের টিকে থাকার জন্যও পরস্পরকে দরকার। এটা ভাবার কোনো উপায় নেই যে জীবজগতের সৃষ্টি নিরর্থক। আরজ আলী সাহেব এরপর প্রশ্ন করেছেন,
“পাপ-পুণ্যের ডায়েরি থাকতে হবে কেন? আল্লাহ যদি সর্বদর্শী ও সর্বশক্তিমান হন, তাহলে মানুষের পাপ-পুণ্য তিনি দেখলেই তো পারেন। ফেরেশতা দিয়ে সংরক্ষণ করার কী দরকার?”
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমরা একটা দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি। ধরা যাক আরজ আলী সাহেবকে পরকালে তার হিসাব-নিকাশসহ ডাকা হলো। আরও ধরা যাক যে, ফেরেশতারা আমাদের পাপ-পুণ্যের হিসাব রাখে না। এমতাবস্থায়, আরজ আলী সাহেবকে ডেকে আল্লাহ যদি বলেন, আরজ আলী, তুমি ইহকালে এই পাপ করেছ, ওই পাপ করেছ। এ জন্য তোমার এই এই শাস্তি। আরজ আলী সাহেব যদি তখন বলে বসে, ‘না তো! আমি তো এসব করিনি! আমি আবার এসব কবে করলাম? কোনো প্রমাণ আছে? প্রমাণ চাই’।
মানুষ যে পাপ-পুণ্য করে, ফেরেশতারা তা লিপিবদ্ধ করেন। এটা তাঁর একটা ডকুমেন্ট, একটা ভিডিওচিত্র, একটা প্রমাণ। আল্লাহ বলেছেন,
“অতএব কেউ অণু-পরিমাণ সৎ কাজ করলে তা সে (হাশরের ময়দানে) দেখবে এবং কেউ অণু-পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তাও সে (সেদিন) দেখবে”।[সূরা যিলযাল (৯৯) : ০৭-০৮]
সেদিন যখন আরজ আলী সাহেব তার কৃতকর্মের কথা অস্বীকার করতে চাইবে তখন আল্লাহ এই ডকুমেন্টস, এই ভিডিওচিত্র প্লে করে বলবেন, “এই দ্যাখো তো। এসব কে করেছে?”
আরজ আলী সাহেবের তখন মনে পড়বে সব। তিনি বলবেন, ‘তাই তো। তাই তো!’ আরজ আলী সাহেবেরা যে অস্বীকার করবে, সেটা আল্লাহ তা’আলা জানেন। তাই তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমেও ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করছেন যাতে এসব অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের আর কোনো জায়গা না থাকে।
একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আল্লাহও তো চাইলে এই ভিডিও বা ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করতে পারতেন। তিনি কেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে এটা সংরক্ষণ করতে গেলেন? বলে রাখা ভালো, এখানে একটি থ্রি স্টেপ ভেরিফিকেশান পদ্ধতি আছে। যেমন, প্রথমে আল্লাহ নিজেই তাদের কৃতকর্মের বর্ণনা শোনাবেন। তারা যদি বলে, মানি না, তখন ফেরেশতাদের সংরক্ষণ করা রেকর্ড আনা হবে তাদের সামনে। এটা দেখেও যদি তারা সন্দেহে ভোগে, বিশ্বাস করতে না চায়, তখন আল্লাহ তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জবান খুলে দেবেন। তখন তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। কুরআন বলছে,
“সেদিন আমি তাদের মুখে সিলমোহর লাগিয়ে দেবো। তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে”।[সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ৩৬]
এই থ্রি স্টেপ ভেরিফিকেশানের একটা মধ্যবর্তী স্টেপে ফেরেশতাদের কাজ আছে। এটার মানে কি এটাই বোঝায় যে আল্লাহ তাআলা এসব সংরক্ষণ করতে অপারগ?
আরজ আলী সাহেব বলেছেন,
“পরকালের সুখ-দুঃখ কি শারীরিক না আধ্যাত্মিক? পরকালের শাস্তি-পুরস্কার সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো ধর্মীয় কিতাবাদি এবং ধর্মযাজকগণ বলে থাকেন, যেমন : শাস্তি হিসেবে পুঁজ, গরম পানি ইত্যাদি এবং পুরস্কার হিসেবে নানান কিছু পাওয়ার কথা জানতে পারি, তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে পরকালের সুখ-দুঃখ আধ্যাত্মিক নয়, শারীরিক। কিন্তু মানুষ মরার পরেই তো পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায়। এমতাবস্থায়, পচে-গলে মাটিতে মিশে যাওয়া মানুষকে তিনি কীভাবে শারীরিকভাবে শাস্তি দেবেন?”
মজার প্রশ্ন। আচ্ছা ধরুন, আপনার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে। সেই স্মার্টফোন দিয়ে আপনার ফেইসবুকে লগ ইন করা আছে। ধরুন, আপনি মনের আনন্দে রিকশায় বসে ফেইসবুক চালাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আপনার রিকশাটা গর্তে পড়ল আর আপনার ফোনটা হাত থেকে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
এখন আপনার ফোনটা তো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এই ফোনে তো আপনার ফেইসবুক আইডি লগ ইন করা ছিল। এখন ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে কি আপনার শখের ফেইসবুক আইডিও নষ্ট হয়ে গেল? আপনার এতদিনের ভার্চুয়াল লাইফ, এত এত ফ্রেন্ড-ফলোয়ার, এ সবকিছু কি ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথেই নষ্ট হয়ে গেল? নাহ। আপনি যখন বাসায় এসে আপনার ল্যাপটপে মেইল আর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ ইন করবেন, দেখবেন আপনার সকল ভার্চুয়াল তথ্য আবার চলে এসেছে আপনার কাছে।
এই কাজটি যদি মার্ক জাকারবার্গ পারে, আল্লাহ পারবেন না কেন? মানুষের শরীরটাকে ফোনের সাথে তুলনা করুন। আর রূহটাকে তুলনা করুন ফেইসবুক আইডির সাথে। এখন আপনার দৈহিক শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও, পরকালে যখন আপনার এই রূহটাকে আপনারই প্রতিকপিতে লগ ইন করানো হবে, তখন কি আপনার শরীরকে ফিরে পাওয়া যাবে না? কাজটা কি আল্লাহর জন্য খুব কঠিন?
নাহ, এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। আল্লাহ বলেছেন,
“তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, পরে তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন”।[সূরা ইউনুস (১০) : ০৪]
আরজ আলী সাহেব এবং তার অনুসারীদের আমরা এটা জানিয়ে রাখতে চাই যে, পরকালের সুখ-দুঃখ অবশ্যই শারীরের ওপর হবে। মানুষের শরীর মরার পরে পচে-গলে মাটির সাথে মিশে গেলেও সেখান থেকে পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা আল্লাহ অবশ্যই রাখেন।
আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন এ রকম,
“ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মুসলমান জাতিরাই লাশ মাটিতে পুতিয়া রাখে, অন্যান্য জাতিরা ইহা করে না। তাহারা কেহ লাশ জলে ভাসাইয়া দেয়, কেহ মাঠে ফেলিয়া রাখে, কেহ পর্বতের চূড়ায় রাখিয়া দেয়, কেহ গাছের শাখায় ঝুলিয়া রাখে”।
আরজ আলী সাহেব মৃতদেহ কবরস্থ করার প্রক্রিয়ার কথা এবং পরকালে শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সবাই তো মৃতদেহ কবরস্থ করে না, বরং কেহবা আগুনে জ্বালাইয়া দেয়। এইভাবে যে সকল মানুষ পরজগতের যাত্রী হয়, তাহাদের গোরআজাব হয় কি না? যদি হয়, তবে কীরূপে? আর যদি না হয়, তবে লাশকে কবরে রাখিয়া লাভ কী?
গোটা ইসলামের কোথাও কিন্তু এই কথা বলা নেই যে পরকালের শাস্তি-পুরস্কার, জান্নাত-জাহান্নাম, বিচারকার্য ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য মৃতদেহকে কবরস্থ করা আবশ্যক। কেউ যদি সাগরে ডুবে মারা যায় এবং তার লাশকে যদি সাগরের মাছেরা খুবলে খায়, তাহলে কি তার পরকালের বিচার হবে না?
আগেই বলেছি, পরকালের শাস্তি-পুরস্কার, আযাব ইত্যাদি মানুষের দুনিয়াবি শরীরের ওপর নির্ভর করে না। কারণ, কবরস্থ করার পরে ব্যক্তিমাত্রেরই লাশ পচে-গলে মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু পরকালের হিসাব-নিকাশ কার্যাবলি সম্পন্নের জন্য যা দরকার তা হলো মানুষের আত্মা বা রূহের। মানুষ পানিতে ডুবে মারা যাক বা আগুনে পুড়ে, তার রূহের কোনোই ক্ষতি হয় না। সেই রূহটাই দরকার পরকালের হিসাব-নিকাশের জন্য। পরকালে আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমতাবলে সেই রূহটাতে আকৃতি দান করবেন। কাজটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।
সুতরাং একজন লোক কীভাবে মারা গেল বা তাকে কীভাবে কবরস্থ করা হলো সেটার ওপর পরকালের হিসাব-নিকাশ মোটেই নির্ভরশীল নয়। আরজ আলী সাহেবের এই ক্ষুদ্র জিনিসটি বোঝা উচিত ছিল বৈকি।
আরজ আলী সাহেব ‘পরলোকের স্বরূপ কী’ এবং ‘স্বর্গ নরক কোথায়?’ শিরোনামে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এই শিরোনামের প্রশ্নে উনার মূল বক্তব্য এ রকম : মানুষ যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে গেছে, পদার্থের অণু হতে পরমাণু পর্যন্ত ভেঙে এখন তার শক্তি পরীক্ষা করতে পারছে, সেহেতু পরকাল বা পরজগৎ যদি থেকেই থাকে, তাহলে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিকগণ পরকালকে দেখতে পায় না কেন?
উনি আরও বলেছেন, পরকাল যদি থেকেই থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই যেকোনো এক সৌরজগতের অধীন। এখন পরকালের বর্ণনা থেকে যেহেতু জানা যায় যে কিয়ামতের ময়দানে সূর্যের প্রখর তাপে পাপীদের মস্তিষ্ক বিগলিত হবে, তাহলে পরকালেও একটি বা একাধিক সূর্য থাকবে। যদি সূর্য থেকে থাকে, তাহলে সেই সূর্য কি ঘুরবে? সেখানেও কি দিনরাত্রি হবে?
আরজ আলী সাহেবের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে হয়, মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে কতটুকু এগিয়েছে ঠিক বলতে পারি না, তবে বিজ্ঞানের দিক থেকে যে খুব একটা মানুষ এগুতে পারেনি এখনো, বিজ্ঞান এখন সেটা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করে।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কার হওয়ার পরে এই সত্য আরও সহজ হয়ে ফুটে উঠেছে। এতদিন মানুষ ভাবত, তারা মনে হয় মহাবিশ্বের সকল রহস্য জেনে বসে আছে। বিশাল মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে এমন কোনো জায়গা হয়তো নেই যেখানে বিজ্ঞানীদের টর্চ লাইটের আলো কিংবা হাবলের টেলিস্কোপ গিয়ে হানা দিয়ে আসেনি। প্রকৃতির এমন কোনো রহস্য হয়তো-বা নেই যেটার পেছনের রহস্য মানুষ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়নি। এ রকম অবস্থায় বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকা মানুষকে বিশাল একটি শোকের সংবাদ শোনাল আমেরিকাভিত্তিক বিজ্ঞানী সংস্থা ‘নাসা’।
তারা জানাচ্ছে, এই সুবিশাল মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ আদতে খুব অল্পই জানতে পেরেছে। সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের জানার পরিমাণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র। নাসা জানাচ্ছে, এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত কেবল ৫% জানতে পেরেছে। বাকি ৯৫% সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না, কিছুই না।
আরজ আলী সাহেব যখন বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে হাবলের টেলিস্কোপ দিয়ে কোনো এক সৌরজগতে জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি নিতান্তই সীমিত। তারা জানাচ্ছে, এত এত প্রযুক্তি, এত এত উন্নত বিজ্ঞান, কল-কৌশল প্রয়োগ করেও আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৫% মহাবিশ্বকে জানতে পেরেছি। বাকি ৯৫% সম্পর্কে আমরা নাকি কিছুই জানি না। আমাদের মহাবিশ্ব, আমাদের পৃথিবী, আমাদের চারপাশের জগৎ, পদার্থের অণু-পরমাণু ইত্যাদি সবকিছু মিলে মাত্র ৫%। বাকি ৯৫% তাহলে কী? এই বাকি ৯৫% হলো অদৃশ্য বস্তু। আমাদের বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’। এই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা সম্প্রতিই জানতে পেরেছি, কিন্তু এখানে কী আছে, এখানে আসলে কী হয়, এটা কোন জগৎ, এটা যদি কোনো জগৎ হয়ে থাকে তাহলে সেই জগতের রহস্য কী তার কোনো কিছুই আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে NASA বলছে,
“More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery.”
অর্থাৎ, সেই জগৎটা কেমন, সেখানে কী হয় তা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে মাত্র ৫% জ্ঞান নিয়ে, বাকি ৯৫% এর ডার্ক ম্যাটারের জগৎ নিয়ে আরজ আলী সাহেবেরা যদি ‘জান্নাত-জাহান্নাম নাই। থাকলে দেখি না কেন’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তখন সত্যিকার অর্থেই হাসি পায়!
তা ছাড়া, আরজ আলী সাহেবেরা ধরেই নিয়েছেন যে, জান্নাত-জাহান্নাম, পরকাল বলে কিছু থেকে থাকলে প্রকৃতি তা আমাদের সামনে মেলে ধরবে, আর আমরা বিজ্ঞানের রঙিন চশমা চোখে লাগিয়ে তা দিব্যি দেখে ফেলতে পারব। কিন্তু বিজ্ঞান কি আমাদের প্রকৃতির সব রহস্য জানাতে পারবে? এর সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে—‘না’। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এসে বিজ্ঞানের এই ধ্রুব সত্যটা আমাদের সকলের কাছে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, বিজ্ঞান-লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার উনার কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইয়ের শুরুতেই এই সত্যটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি তার বইতে লিখেছেন,
‘কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। যদি কখনো দেখি কোনো একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি। যখন জানা হবে তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়েই নিখুত এবং সুনিশ্চিত। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না। সে তার ভিতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষ কখনোই সেটা জানতে পারবে না। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয়। এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোর গলায় বলবেন না হবে, তারা মাথা নেড়ে বলবে—‘হতে পারে’।[কোয়ান্টাম মেকানিক্স, মু. জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা : ১০]
জাফর ইকবাল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দোহাই দিয়ে বলছেন, ‘বিজ্ঞান দিয়ে কখনোই আমরা প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবো না। কিছু কিছু রহস্য আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে’।
এই যখন বিজ্ঞানের হাল, তখন সেই বিজ্ঞানের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে বৈজ্ঞানিক ফিতা দিয়ে বাস্তব দুনিয়া রেখে ‘পরাবাস্তব’ দুনিয়ার জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে নামাটা নিতান্তই নিম্নবুদ্ধির পরিচায়ক নয় কি? তা ছাড়া, বিজ্ঞান যে ‘পরকাল’ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই দিচ্ছে না তাও কিন্তু নয়। সাইন্টিফিক ওয়ার্ল্ডে এখন ‘Afterlife’ নিয়ে ব্যাপক কাজ হচ্ছে।
অনেক বিজ্ঞানী এখন এই ‘Afterlife’ তথা ‘পরকাল’ নিয়ে গবেষণা করছেন। এক্ষেত্রে মেডিকেল সাইন্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি পাওয়া ‘Near Death Experience’ ফিল্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। Near Death Experience কী? Near Death Experience হচ্ছে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার ওপর একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা।
একসিডেন্ট, হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো কারণে যখন মানুষের হার্ট এবং ব্রেইন উভয়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন মেডিকেলীয় ভাষায় সেটাকে ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ বলা হয়। ডাক্তারগণ ঘোষণা করেন যে ব্যক্তিটা মৃত। ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ ঘোষনা করার পরেও অনেক সময় কিছু কিছু লোক আল্লাহর ইচ্ছাতে প্রাণ ফিরে পায়। তারা বেঁচে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ রকম অহরহ ঘটনা ঘটে থাকে। ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষিত হবার পরও মৃতব্যক্তির প্রাণ ফিরে পাওয়া এ রকম ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে বেঁচে আসা লোকদের নিয়ে কাজ করে ‘Near Death Experience Research Foundation’। এই ফাউন্ডেশনের কাজ হলো বিশ্বের যে প্রান্তেই এ রকম ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তথ্য সংগ্রহ করা।
এখন পর্যন্ত এই ফাউন্ডেশন প্রায় পাঁচ হাজার ক্লিনিক্যালি ডেথ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় সবার এক্সপেরিয়েন্স এক্ষেত্রে একই রকম হয়।
ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মানুষজন জানায়, তাদের হার্ট, ব্রেইন নিষ্ক্রিয় দেখে তাদের যখন ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষণা করা হয়, তারপরও তারা তাদের চারপাশের সবকিছু দেখতে, শুনতে ও বুঝতে পারে। তারা বিচিত্র কিছু আলো দেখতে পায়। কারও কারও অভিজ্ঞতা এক গভীর নিকষ অন্ধকারের মধ্যে তাদের ছুটতে হচ্ছে, আবার কারও কারও অভিজ্ঞতা তারা ধবধবে সাদা, শুভ্র আলোর ঝলকানি দেখতে পায়। তারা জানায়, এই অবস্থায় তারা (মেইনলি তাদের আত্মা) বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এমনকি তখন তাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এই পাঁচ হাজার লোকের এ রকম Near Death Experience কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানী Jeffrey Long একটি বই লেখেন। বইটির নাম “Evidence of the Afterlife”।
মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে গবেষণা করছে এ রকম আরও অনেক বিজ্ঞানী আছে, যেমন : Dr. Marry Neal, Dr. Kevin Nelson, DR. Sam Parnia, Dr. Jeffrey Long, Dr. Mario Beauregard, Dr. Peter Fenwick প্রমূখ।
আফসোস করতে হয়, বিজ্ঞানের ফিতা দিয়ে পরকালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে চাওয়া আরজ আলী সাহেবেরা যদি আজকের দিনে বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো দেখতে পেতেন যে, পরকালও এখন বিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তারা বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে পরকালকে অস্বীকার করত, সেই বিজ্ঞানই যে একসময় তাদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফেরত আসবে তা যদি তারা জানত!
উনি জানতে চেয়েছেন কিয়ামতের মাঠের সূর্যটা আসলে কীরূপ হবে, সেটা কি ঘুরবে না স্থির থাকবে?
উনি যখন কিয়ামতের মাঠ অবধি ‘ধরে’ নিয়ে এগিয়েছেন, তাহলে তিনি স্রষ্টা বলেও কেউ একজনকে আপাতত স্বীকার করেই এগিয়েছেন। এখন যেই স্রষ্টা এই সুবিশাল সুনিপুণ পরিচালনাধীন মহাবিশ্বকে ধ্বংস করতে সক্ষম, যিনি সূর্যকে তার নিজস্ব কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম, তিনি কি চাইলেই সেই সূর্যকে বা সূর্যের মতোই কোনো কিছুকে কিয়ামতের মাঠে পুনর্বার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? তিনি অবশ্যই সক্ষম।
“তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়”।[সুরা বাকারাহ (০২) :১১৭]
উনি প্রশ্ন করেছেন, পরকালের বিষয়াদি, যেমন : কবরের সওয়াল-জওয়াব, মিযান, বিচারদিবস ইত্যাদি দুনিয়ার বিষয়বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেন? যেমন : এখানে হাইকোর্টে অপরাধীর বিচার হয়, সওয়াল-জওয়াব হয়, তার বিচারকার্য সম্পাদিত হয়। পরকালের বিষয়গুলোও ঠিক এ রকম কেন? অভিনব কিছু নেই কেন?
পরকালের বিষয়গুলো দুনিয়াবি ব্যাপারাদির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর কারণ হলো এই যে, দুনিয়ায় যখন আমাদের সামনে এসব ব্যাপার নিয়ে আলাপ করা হবে, তখন আমরা যেন সেগুলো খুব ভালোমতোই অনুধাবন করতে পারি। যদি জিনিসগুলো এমনই হতো যে আমরা সেসব সম্পর্কে কিছুই জানি না বা সেসব সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখি না, তাহলে আমরা পরকাল, জান্নাত-জাহান্নামকে কীভাবে অনুধাবন করব? যদি অনুধাবনই না করতে পারি, তাহলে সেই জগৎ সম্পর্কে আমরা বুঝব কীভাবে?
আমরা যাতে খুব সহজেই বুঝতে পারি, অনুধাবন করতে পারি, সে মোতাবেক নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারি, সে জন্যই তিনি সেগুলোকে এভাবে আমাদের পরিচিত বিষয়াদির মতো করেই সাজিয়েছেন। আমরা যখন কোনো কিছু কাউকে বুঝাই, তখন আমরা সেই উদাহরণটাই টেনে আনি যেটা আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত, যেটা দিয়ে বোঝালে যাকে বোঝানো হচ্ছে সে খুব সহজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। এতে করে কি এটা প্রমাণ হয় যে আমি যাকে বুঝাচ্ছি তার কাছ থেকে আইডিয়া চুরি করেছি? নাহ। সে রকম কিছুই বোঝায় না। বরং এটা আমার জ্ঞান, কৌশল এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। ঠিক সেভাবে আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলাও আমাদের এমন উপমা, এমন বর্ণনা দিয়ে বুঝিয়েছেন, যাতে করে আমরা সেগুলো খুব ভালো করে অনুধাবন করতে পারি। বুঝতে পারি।
‘পরকাল’ বিষয়ে আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করার আগে একটি বিষয় বলা জরুরি মনে করছি। উনার প্রশ্নগুলোকে হুবহু উল্লেখ করে কলেবর বৃদ্ধি না করে এখন থেকে আমরা উনার প্রশ্নের মূল পয়েন্ট নিয়ে আগাব, ইনশাআল্লাহ। এই অধ্যায়ের শুরুতেই আরজ আলী মাতুব্বর প্রশ্ন করেছেন, “জীব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?”
তিনি বলেছেন,
‘মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য যদি হয় আল্লাহর নাম ও গুণকীর্তন করা, তাহলে জীব সৃষ্টির কারণ কী?’
আরজ আলী সাহেব ঠিক বলেছেন। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদাত করা। আর অন্যান্য সবকিছুকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের জন্য। যেমন : কুরআণ ঘোষণা দেয়,
“পৃথিবীর সবকিছু তিনি তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন”।[সূরা আল বাকারা (০২) : ২৯]
তাহলে মানুষ সৃষ্টির পাশাপাশি জীবজগৎ কেন সৃষ্টি করা হয়েছে তা কুরআন সুষ্পষ্টরূপে জানিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ তোলার আর কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না। প্রশ্ন তোলার আগে আরজ আলী সাহেব কুরআনটাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখলেই উত্তর পেয়ে যেতেন বলে মনে করি। এ ছাড়াও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য জীবজগতের রয়েছে ব্যাপক অবদান। “খাদ্যশৃঙ্খল” নামের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবজগৎ থেকে উদ্ভিদজগৎ সবার রয়েছে কোনো না কোনো অবদান। প্রকৃতির সকল জীবজগৎ এবং উদ্ভিদজগৎ কোনো না-কোনোভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং প্রকৃতিতে মানুষ এবং জীবজগতের টিকে থাকার জন্যও পরস্পরকে দরকার। এটা ভাবার কোনো উপায় নেই যে জীবজগতের সৃষ্টি নিরর্থক। আরজ আলী সাহেব এরপর প্রশ্ন করেছেন,
“পাপ-পুণ্যের ডায়েরি থাকতে হবে কেন? আল্লাহ যদি সর্বদর্শী ও সর্বশক্তিমান হন, তাহলে মানুষের পাপ-পুণ্য তিনি দেখলেই তো পারেন। ফেরেশতা দিয়ে সংরক্ষণ করার কী দরকার?”
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমরা একটা দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি। ধরা যাক আরজ আলী সাহেবকে পরকালে তার হিসাব-নিকাশসহ ডাকা হলো। আরও ধরা যাক যে, ফেরেশতারা আমাদের পাপ-পুণ্যের হিসাব রাখে না। এমতাবস্থায়, আরজ আলী সাহেবকে ডেকে আল্লাহ যদি বলেন, আরজ আলী, তুমি ইহকালে এই পাপ করেছ, ওই পাপ করেছ। এ জন্য তোমার এই এই শাস্তি। আরজ আলী সাহেব যদি তখন বলে বসে, ‘না তো! আমি তো এসব করিনি! আমি আবার এসব কবে করলাম? কোনো প্রমাণ আছে? প্রমাণ চাই’।
মানুষ যে পাপ-পুণ্য করে, ফেরেশতারা তা লিপিবদ্ধ করেন। এটা তাঁর একটা ডকুমেন্ট, একটা ভিডিওচিত্র, একটা প্রমাণ। আল্লাহ বলেছেন,
“অতএব কেউ অণু-পরিমাণ সৎ কাজ করলে তা সে (হাশরের ময়দানে) দেখবে এবং কেউ অণু-পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তাও সে (সেদিন) দেখবে”।[সূরা যিলযাল (৯৯) : ০৭-০৮]
সেদিন যখন আরজ আলী সাহেব তার কৃতকর্মের কথা অস্বীকার করতে চাইবে তখন আল্লাহ এই ডকুমেন্টস, এই ভিডিওচিত্র প্লে করে বলবেন, “এই দ্যাখো তো। এসব কে করেছে?”
আরজ আলী সাহেবের তখন মনে পড়বে সব। তিনি বলবেন, ‘তাই তো। তাই তো!’ আরজ আলী সাহেবেরা যে অস্বীকার করবে, সেটা আল্লাহ তা’আলা জানেন। তাই তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমেও ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করছেন যাতে এসব অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের আর কোনো জায়গা না থাকে।
একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আল্লাহও তো চাইলে এই ভিডিও বা ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করতে পারতেন। তিনি কেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে এটা সংরক্ষণ করতে গেলেন? বলে রাখা ভালো, এখানে একটি থ্রি স্টেপ ভেরিফিকেশান পদ্ধতি আছে। যেমন, প্রথমে আল্লাহ নিজেই তাদের কৃতকর্মের বর্ণনা শোনাবেন। তারা যদি বলে, মানি না, তখন ফেরেশতাদের সংরক্ষণ করা রেকর্ড আনা হবে তাদের সামনে। এটা দেখেও যদি তারা সন্দেহে ভোগে, বিশ্বাস করতে না চায়, তখন আল্লাহ তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জবান খুলে দেবেন। তখন তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। কুরআন বলছে,
“সেদিন আমি তাদের মুখে সিলমোহর লাগিয়ে দেবো। তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে”।[সূরা ইয়াসীন (৩৬) : ৩৬]
এই থ্রি স্টেপ ভেরিফিকেশানের একটা মধ্যবর্তী স্টেপে ফেরেশতাদের কাজ আছে। এটার মানে কি এটাই বোঝায় যে আল্লাহ তাআলা এসব সংরক্ষণ করতে অপারগ?
আরজ আলী সাহেব বলেছেন,
“পরকালের সুখ-দুঃখ কি শারীরিক না আধ্যাত্মিক? পরকালের শাস্তি-পুরস্কার সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো ধর্মীয় কিতাবাদি এবং ধর্মযাজকগণ বলে থাকেন, যেমন : শাস্তি হিসেবে পুঁজ, গরম পানি ইত্যাদি এবং পুরস্কার হিসেবে নানান কিছু পাওয়ার কথা জানতে পারি, তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে পরকালের সুখ-দুঃখ আধ্যাত্মিক নয়, শারীরিক। কিন্তু মানুষ মরার পরেই তো পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায়। এমতাবস্থায়, পচে-গলে মাটিতে মিশে যাওয়া মানুষকে তিনি কীভাবে শারীরিকভাবে শাস্তি দেবেন?”
মজার প্রশ্ন। আচ্ছা ধরুন, আপনার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে। সেই স্মার্টফোন দিয়ে আপনার ফেইসবুকে লগ ইন করা আছে। ধরুন, আপনি মনের আনন্দে রিকশায় বসে ফেইসবুক চালাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আপনার রিকশাটা গর্তে পড়ল আর আপনার ফোনটা হাত থেকে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
এখন আপনার ফোনটা তো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এই ফোনে তো আপনার ফেইসবুক আইডি লগ ইন করা ছিল। এখন ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে কি আপনার শখের ফেইসবুক আইডিও নষ্ট হয়ে গেল? আপনার এতদিনের ভার্চুয়াল লাইফ, এত এত ফ্রেন্ড-ফলোয়ার, এ সবকিছু কি ফোন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথেই নষ্ট হয়ে গেল? নাহ। আপনি যখন বাসায় এসে আপনার ল্যাপটপে মেইল আর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ ইন করবেন, দেখবেন আপনার সকল ভার্চুয়াল তথ্য আবার চলে এসেছে আপনার কাছে।
এই কাজটি যদি মার্ক জাকারবার্গ পারে, আল্লাহ পারবেন না কেন? মানুষের শরীরটাকে ফোনের সাথে তুলনা করুন। আর রূহটাকে তুলনা করুন ফেইসবুক আইডির সাথে। এখন আপনার দৈহিক শরীর নষ্ট হয়ে গেলেও, পরকালে যখন আপনার এই রূহটাকে আপনারই প্রতিকপিতে লগ ইন করানো হবে, তখন কি আপনার শরীরকে ফিরে পাওয়া যাবে না? কাজটা কি আল্লাহর জন্য খুব কঠিন?
নাহ, এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। আল্লাহ বলেছেন,
“তিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, পরে তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন”।[সূরা ইউনুস (১০) : ০৪]
আরজ আলী সাহেব এবং তার অনুসারীদের আমরা এটা জানিয়ে রাখতে চাই যে, পরকালের সুখ-দুঃখ অবশ্যই শারীরের ওপর হবে। মানুষের শরীর মরার পরে পচে-গলে মাটির সাথে মিশে গেলেও সেখান থেকে পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা আল্লাহ অবশ্যই রাখেন।
আরজ আলী সাহেব প্রশ্ন করেছেন এ রকম,
“ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মুসলমান জাতিরাই লাশ মাটিতে পুতিয়া রাখে, অন্যান্য জাতিরা ইহা করে না। তাহারা কেহ লাশ জলে ভাসাইয়া দেয়, কেহ মাঠে ফেলিয়া রাখে, কেহ পর্বতের চূড়ায় রাখিয়া দেয়, কেহ গাছের শাখায় ঝুলিয়া রাখে”।
আরজ আলী সাহেব মৃতদেহ কবরস্থ করার প্রক্রিয়ার কথা এবং পরকালে শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সবাই তো মৃতদেহ কবরস্থ করে না, বরং কেহবা আগুনে জ্বালাইয়া দেয়। এইভাবে যে সকল মানুষ পরজগতের যাত্রী হয়, তাহাদের গোরআজাব হয় কি না? যদি হয়, তবে কীরূপে? আর যদি না হয়, তবে লাশকে কবরে রাখিয়া লাভ কী?
গোটা ইসলামের কোথাও কিন্তু এই কথা বলা নেই যে পরকালের শাস্তি-পুরস্কার, জান্নাত-জাহান্নাম, বিচারকার্য ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য মৃতদেহকে কবরস্থ করা আবশ্যক। কেউ যদি সাগরে ডুবে মারা যায় এবং তার লাশকে যদি সাগরের মাছেরা খুবলে খায়, তাহলে কি তার পরকালের বিচার হবে না?
আগেই বলেছি, পরকালের শাস্তি-পুরস্কার, আযাব ইত্যাদি মানুষের দুনিয়াবি শরীরের ওপর নির্ভর করে না। কারণ, কবরস্থ করার পরে ব্যক্তিমাত্রেরই লাশ পচে-গলে মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু পরকালের হিসাব-নিকাশ কার্যাবলি সম্পন্নের জন্য যা দরকার তা হলো মানুষের আত্মা বা রূহের। মানুষ পানিতে ডুবে মারা যাক বা আগুনে পুড়ে, তার রূহের কোনোই ক্ষতি হয় না। সেই রূহটাই দরকার পরকালের হিসাব-নিকাশের জন্য। পরকালে আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমতাবলে সেই রূহটাতে আকৃতি দান করবেন। কাজটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।
সুতরাং একজন লোক কীভাবে মারা গেল বা তাকে কীভাবে কবরস্থ করা হলো সেটার ওপর পরকালের হিসাব-নিকাশ মোটেই নির্ভরশীল নয়। আরজ আলী সাহেবের এই ক্ষুদ্র জিনিসটি বোঝা উচিত ছিল বৈকি।
আরজ আলী সাহেব ‘পরলোকের স্বরূপ কী’ এবং ‘স্বর্গ নরক কোথায়?’ শিরোনামে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এই শিরোনামের প্রশ্নে উনার মূল বক্তব্য এ রকম : মানুষ যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে গেছে, পদার্থের অণু হতে পরমাণু পর্যন্ত ভেঙে এখন তার শক্তি পরীক্ষা করতে পারছে, সেহেতু পরকাল বা পরজগৎ যদি থেকেই থাকে, তাহলে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিকগণ পরকালকে দেখতে পায় না কেন?
উনি আরও বলেছেন, পরকাল যদি থেকেই থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই যেকোনো এক সৌরজগতের অধীন। এখন পরকালের বর্ণনা থেকে যেহেতু জানা যায় যে কিয়ামতের ময়দানে সূর্যের প্রখর তাপে পাপীদের মস্তিষ্ক বিগলিত হবে, তাহলে পরকালেও একটি বা একাধিক সূর্য থাকবে। যদি সূর্য থেকে থাকে, তাহলে সেই সূর্য কি ঘুরবে? সেখানেও কি দিনরাত্রি হবে?
আরজ আলী সাহেবের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে হয়, মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে কতটুকু এগিয়েছে ঠিক বলতে পারি না, তবে বিজ্ঞানের দিক থেকে যে খুব একটা মানুষ এগুতে পারেনি এখনো, বিজ্ঞান এখন সেটা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করে।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কার হওয়ার পরে এই সত্য আরও সহজ হয়ে ফুটে উঠেছে। এতদিন মানুষ ভাবত, তারা মনে হয় মহাবিশ্বের সকল রহস্য জেনে বসে আছে। বিশাল মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে এমন কোনো জায়গা হয়তো নেই যেখানে বিজ্ঞানীদের টর্চ লাইটের আলো কিংবা হাবলের টেলিস্কোপ গিয়ে হানা দিয়ে আসেনি। প্রকৃতির এমন কোনো রহস্য হয়তো-বা নেই যেটার পেছনের রহস্য মানুষ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়নি। এ রকম অবস্থায় বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকা মানুষকে বিশাল একটি শোকের সংবাদ শোনাল আমেরিকাভিত্তিক বিজ্ঞানী সংস্থা ‘নাসা’।
তারা জানাচ্ছে, এই সুবিশাল মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ আদতে খুব অল্পই জানতে পেরেছে। সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের জানার পরিমাণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র। নাসা জানাচ্ছে, এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত কেবল ৫% জানতে পেরেছে। বাকি ৯৫% সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না, কিছুই না।
আরজ আলী সাহেব যখন বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে হাবলের টেলিস্কোপ দিয়ে কোনো এক সৌরজগতে জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি নিতান্তই সীমিত। তারা জানাচ্ছে, এত এত প্রযুক্তি, এত এত উন্নত বিজ্ঞান, কল-কৌশল প্রয়োগ করেও আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৫% মহাবিশ্বকে জানতে পেরেছি। বাকি ৯৫% সম্পর্কে আমরা নাকি কিছুই জানি না। আমাদের মহাবিশ্ব, আমাদের পৃথিবী, আমাদের চারপাশের জগৎ, পদার্থের অণু-পরমাণু ইত্যাদি সবকিছু মিলে মাত্র ৫%। বাকি ৯৫% তাহলে কী? এই বাকি ৯৫% হলো অদৃশ্য বস্তু। আমাদের বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’। এই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা সম্প্রতিই জানতে পেরেছি, কিন্তু এখানে কী আছে, এখানে আসলে কী হয়, এটা কোন জগৎ, এটা যদি কোনো জগৎ হয়ে থাকে তাহলে সেই জগতের রহস্য কী তার কোনো কিছুই আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে NASA বলছে,
“More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery.”
অর্থাৎ, সেই জগৎটা কেমন, সেখানে কী হয় তা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে মাত্র ৫% জ্ঞান নিয়ে, বাকি ৯৫% এর ডার্ক ম্যাটারের জগৎ নিয়ে আরজ আলী সাহেবেরা যদি ‘জান্নাত-জাহান্নাম নাই। থাকলে দেখি না কেন’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তখন সত্যিকার অর্থেই হাসি পায়!
তা ছাড়া, আরজ আলী সাহেবেরা ধরেই নিয়েছেন যে, জান্নাত-জাহান্নাম, পরকাল বলে কিছু থেকে থাকলে প্রকৃতি তা আমাদের সামনে মেলে ধরবে, আর আমরা বিজ্ঞানের রঙিন চশমা চোখে লাগিয়ে তা দিব্যি দেখে ফেলতে পারব। কিন্তু বিজ্ঞান কি আমাদের প্রকৃতির সব রহস্য জানাতে পারবে? এর সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে—‘না’। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এসে বিজ্ঞানের এই ধ্রুব সত্যটা আমাদের সকলের কাছে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি, বিজ্ঞান-লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার উনার কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইয়ের শুরুতেই এই সত্যটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি তার বইতে লিখেছেন,
‘কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। যদি কখনো দেখি কোনো একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি। যখন জানা হবে তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়েই নিখুত এবং সুনিশ্চিত। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবে না। সে তার ভিতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষ কখনোই সেটা জানতে পারবে না। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয়। এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোর গলায় বলবেন না হবে, তারা মাথা নেড়ে বলবে—‘হতে পারে’।[কোয়ান্টাম মেকানিক্স, মু. জাফর ইকবাল, পৃষ্ঠা : ১০]
জাফর ইকবাল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দোহাই দিয়ে বলছেন, ‘বিজ্ঞান দিয়ে কখনোই আমরা প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবো না। কিছু কিছু রহস্য আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে’।
এই যখন বিজ্ঞানের হাল, তখন সেই বিজ্ঞানের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে বৈজ্ঞানিক ফিতা দিয়ে বাস্তব দুনিয়া রেখে ‘পরাবাস্তব’ দুনিয়ার জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে নামাটা নিতান্তই নিম্নবুদ্ধির পরিচায়ক নয় কি? তা ছাড়া, বিজ্ঞান যে ‘পরকাল’ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই দিচ্ছে না তাও কিন্তু নয়। সাইন্টিফিক ওয়ার্ল্ডে এখন ‘Afterlife’ নিয়ে ব্যাপক কাজ হচ্ছে।
অনেক বিজ্ঞানী এখন এই ‘Afterlife’ তথা ‘পরকাল’ নিয়ে গবেষণা করছেন। এক্ষেত্রে মেডিকেল সাইন্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি পাওয়া ‘Near Death Experience’ ফিল্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। Near Death Experience কী? Near Death Experience হচ্ছে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার ওপর একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা।
একসিডেন্ট, হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো কারণে যখন মানুষের হার্ট এবং ব্রেইন উভয়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন মেডিকেলীয় ভাষায় সেটাকে ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ বলা হয়। ডাক্তারগণ ঘোষণা করেন যে ব্যক্তিটা মৃত। ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ ঘোষনা করার পরেও অনেক সময় কিছু কিছু লোক আল্লাহর ইচ্ছাতে প্রাণ ফিরে পায়। তারা বেঁচে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ রকম অহরহ ঘটনা ঘটে থাকে। ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষিত হবার পরও মৃতব্যক্তির প্রাণ ফিরে পাওয়া এ রকম ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে বেঁচে আসা লোকদের নিয়ে কাজ করে ‘Near Death Experience Research Foundation’। এই ফাউন্ডেশনের কাজ হলো বিশ্বের যে প্রান্তেই এ রকম ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তথ্য সংগ্রহ করা।
এখন পর্যন্ত এই ফাউন্ডেশন প্রায় পাঁচ হাজার ক্লিনিক্যালি ডেথ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় সবার এক্সপেরিয়েন্স এক্ষেত্রে একই রকম হয়।
ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মানুষজন জানায়, তাদের হার্ট, ব্রেইন নিষ্ক্রিয় দেখে তাদের যখন ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষণা করা হয়, তারপরও তারা তাদের চারপাশের সবকিছু দেখতে, শুনতে ও বুঝতে পারে। তারা বিচিত্র কিছু আলো দেখতে পায়। কারও কারও অভিজ্ঞতা এক গভীর নিকষ অন্ধকারের মধ্যে তাদের ছুটতে হচ্ছে, আবার কারও কারও অভিজ্ঞতা তারা ধবধবে সাদা, শুভ্র আলোর ঝলকানি দেখতে পায়। তারা জানায়, এই অবস্থায় তারা (মেইনলি তাদের আত্মা) বাধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এমনকি তখন তাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
এই পাঁচ হাজার লোকের এ রকম Near Death Experience কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানী Jeffrey Long একটি বই লেখেন। বইটির নাম “Evidence of the Afterlife”।
মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে গবেষণা করছে এ রকম আরও অনেক বিজ্ঞানী আছে, যেমন : Dr. Marry Neal, Dr. Kevin Nelson, DR. Sam Parnia, Dr. Jeffrey Long, Dr. Mario Beauregard, Dr. Peter Fenwick প্রমূখ।
আফসোস করতে হয়, বিজ্ঞানের ফিতা দিয়ে পরকালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপতে চাওয়া আরজ আলী সাহেবেরা যদি আজকের দিনে বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো দেখতে পেতেন যে, পরকালও এখন বিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তারা বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে পরকালকে অস্বীকার করত, সেই বিজ্ঞানই যে একসময় তাদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফেরত আসবে তা যদি তারা জানত!
উনি জানতে চেয়েছেন কিয়ামতের মাঠের সূর্যটা আসলে কীরূপ হবে, সেটা কি ঘুরবে না স্থির থাকবে?
উনি যখন কিয়ামতের মাঠ অবধি ‘ধরে’ নিয়ে এগিয়েছেন, তাহলে তিনি স্রষ্টা বলেও কেউ একজনকে আপাতত স্বীকার করেই এগিয়েছেন। এখন যেই স্রষ্টা এই সুবিশাল সুনিপুণ পরিচালনাধীন মহাবিশ্বকে ধ্বংস করতে সক্ষম, যিনি সূর্যকে তার নিজস্ব কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম, তিনি কি চাইলেই সেই সূর্যকে বা সূর্যের মতোই কোনো কিছুকে কিয়ামতের মাঠে পুনর্বার সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? তিনি অবশ্যই সক্ষম।
“তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তিনি কেবল বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়”।[সুরা বাকারাহ (০২) :১১৭]
উনি প্রশ্ন করেছেন, পরকালের বিষয়াদি, যেমন : কবরের সওয়াল-জওয়াব, মিযান, বিচারদিবস ইত্যাদি দুনিয়ার বিষয়বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেন? যেমন : এখানে হাইকোর্টে অপরাধীর বিচার হয়, সওয়াল-জওয়াব হয়, তার বিচারকার্য সম্পাদিত হয়। পরকালের বিষয়গুলোও ঠিক এ রকম কেন? অভিনব কিছু নেই কেন?
পরকালের বিষয়গুলো দুনিয়াবি ব্যাপারাদির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর কারণ হলো এই যে, দুনিয়ায় যখন আমাদের সামনে এসব ব্যাপার নিয়ে আলাপ করা হবে, তখন আমরা যেন সেগুলো খুব ভালোমতোই অনুধাবন করতে পারি। যদি জিনিসগুলো এমনই হতো যে আমরা সেসব সম্পর্কে কিছুই জানি না বা সেসব সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখি না, তাহলে আমরা পরকাল, জান্নাত-জাহান্নামকে কীভাবে অনুধাবন করব? যদি অনুধাবনই না করতে পারি, তাহলে সেই জগৎ সম্পর্কে আমরা বুঝব কীভাবে?
আমরা যাতে খুব সহজেই বুঝতে পারি, অনুধাবন করতে পারি, সে মোতাবেক নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে পারি, সে জন্যই তিনি সেগুলোকে এভাবে আমাদের পরিচিত বিষয়াদির মতো করেই সাজিয়েছেন। আমরা যখন কোনো কিছু কাউকে বুঝাই, তখন আমরা সেই উদাহরণটাই টেনে আনি যেটা আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত, যেটা দিয়ে বোঝালে যাকে বোঝানো হচ্ছে সে খুব সহজেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। এতে করে কি এটা প্রমাণ হয় যে আমি যাকে বুঝাচ্ছি তার কাছ থেকে আইডিয়া চুরি করেছি? নাহ। সে রকম কিছুই বোঝায় না। বরং এটা আমার জ্ঞান, কৌশল এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। ঠিক সেভাবে আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলাও আমাদের এমন উপমা, এমন বর্ণনা দিয়ে বুঝিয়েছেন, যাতে করে আমরা সেগুলো খুব ভালো করে অনুধাবন করতে পারি। বুঝতে পারি।