মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ১৪/২০

(১৪) কোরআন কি মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিজের কথা?

কোরআন কি মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিজের কথা?

সাজিদ একটি মজার গল্প বলতে শুরু করলো। গল্প বলার আগে কয়েকবার ঝেঁড়ে কেশে নিলো সে।

সাজিদ যখন কোন গল্প বলতে শুরু করে, তখন সে গল্পটির একটি সুন্দর নাম দেয়। এখন সে যে গল্পটি বলতে শুরু করেছে, সেটার নাম 'নিউটন- আইনষ্টাইন সমঝোতা এবং বোকা আইনষ্টাইনের বিজ্ঞানী হাবলুর কাছে নতিস্বীকার'।

এইখানে নিউটন আর আইনষ্টাইনকে তো চিনিই, কিন্তু বিজ্ঞানী হাবলুটা যে আসলে কে, সেটা ঠিক বুঝলাম না প্রথমে। না বুঝলেও কিছু করার নেই। গল্প শুরু না হলে সাজিদকে এ নিয়ে প্রশ্ন করাও যাবে না। এটা তার গল্প ক্লাশের প্রাথমিক শর্ত।

শুধু যে এটা বুঝিনি তা নয়। আরেকটি ব্যাপারও বুঝলাম না। গল্পের নামে বলা হলো 'নিউটন-আইনষ্টাইনের সমঝোতা।' বিজ্ঞানি নিউটনের সাথে তো বিজ্ঞানি আইনষ্টাইনের কোনদিন সাক্ষাতও হলো না। দু'জন সম্পূর্ণ দুই প্রজন্মের। তাদের মধ্যে তাহলে সমঝোতাই কিভাবে হোলো? মনের মধ্যে প্রশ্ন দুটো কুটকুটানি শুরু করে দিলো। না পারছি চেপে রাখতে, না পারছি উগরে দিতে।

সাজিদ গল্প বলা শুরু করলো। সাজিদের গল্প ক্লাশে উপস্থিত আছি আমি, রাব্বি, রোহান, মোস্তফা আর সবুজ। আমাদের মধ্যে রোহান নাস্তিক টাইপের। পুরোপুরি নাস্তিক নয়, এগনোষ্টিক বলা যেতে পারে। তার ধারনা, মুহাম্মদ (সাঃ) নিজের কথাগুলোকে ইশ্বরের বাণী বলে চালিয়ে দিয়েছে।

যাহোক, আজকে কোরানের বিশুদ্ধতা প্রমানের জন্য তারা বসে নি। গল্প শুনতে বসেছে। এই সপ্তাহে সাজিদ গল্প বলবে। এর পরের সপ্তাহে আরেকজন। তারপরের সপ্তাহে আরেকজন, এভাবে।

সাজিদ বলতে শুরু করলো,---

'আজকে বলবো মহাকাশ নিয়ে গল্প। মহাকাশ নিয়ে বলার আগে বলে নিই,

তখনও Astronomy তথা জ্যোতির্বিদ্যা পদার্থবিদ্যার আওতাভুক্ত হয়নি। অনন্ত মহাকাশ নিয়ে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলো ব্যাপক রকম মতপার্থক্য।

এই জিনিসটা পদার্থবিদ্যার আওতায় আসার আগে এটা ফিলোসপির বিষয় ছিলো। কারো ধারনা ছিলো মহাকাশ অসীম, মানে মহাকাশের কোন শেষ নেই। কারো ধারনা ছিলো মহাকাশ অসীম নয়, মহাকাশ সসীম। এটি একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এ দুয়ের বাইরে গিয়ে আরেকদল মনে করতো, মহাকাশ অসীম, তবে স্থির। অর্থাৎ, এর নির্দিষ্ট সীমা নেই ঠিক, কিন্তু এটি স্থির।

বিজ্ঞানী নিউটনও তৃতীয় ধারনাটির পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত 'মহাকর্ষীয় তত্ব' আবিষ্কার করে তখন বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু, এত জনপ্রিয় একটি তত্বের মধ্যে খুবই সুক্ষ্ম একটি ঘাপলা রয়ে গিয়েছিলো।'

নিউটনের সূত্রের মধ্যে ঘাপলা ছিলো শুনে ম্যানেজমেণ্টের ছাত্র রাব্বি তার চোখজোড়া বড় বড় করে বললো,- 'বলিস কি? প্রতিষ্ঠিত সূত্রের মধ্যে ঘাপলা? এরকমও হয় নাকি?'

সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ।'

- 'কি রকম ঘাপলা?'- রাব্বির পাল্টা প্রশ্ন।

সাজিদ বললো,- ' নিউটনের সূত্র মতে, মহাবিশ্বের বস্তুগুলো একে-অপরকে নিজেদের দিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু ঘাপলা হচ্ছে, যদি এমনটি হয়, তাহলে মহাশূন্যের বস্তুগুলো নির্দিষ্ট একটি পয়েণ্টে এসে মিলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবার কথা। এমনটি হয়না কেনো?'

সমাজতত্বের ছাত্র সবুজ বললো, - তাই তো। নিউটন এর কি ব্যাখ্যা দিয়েছে?'

সাজিদ বললো,- 'নিউটনের কাছে এর কোন ব্যাখ্যা ছিলো না। এই ব্যাপারটা পরে ক্লিয়ার করেছে বিজ্ঞানী আইনষ্টাইন, তার বিখ্যাত 'Theory Of Relativity' দিয়ে। আইনষ্টাইন নিউটনের অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধানে বলেছেন, এরকম হতো, যদি Time আর Space শাশ্বত বা পরম হতো। কিন্তু Time আর Space কখনোই পরম নয়। এই বিখ্যাত তত্ব দিয়ে বিজ্ঞানি আইনষ্টাইন বিজ্ঞানকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এক নতুন জগতের সাথে। সেই জগতটির নাম 'আপেক্ষিকতার জগত।'

রাব্বি বললো,- 'ও আচ্ছা, এইজন্যে গল্পের নাম দিয়েছিস 'নিউটন-আইনষ্টাইনের সমঝোতা', তাই না?'

সাজিদ মুচকি হাসলো। আমি একটা সুযোগ পেলাম প্রশ্ন করার। জিজ্ঞেস করলাম,- 'কিন্তু বিজ্ঞানি হাবলুটা আসলে কে?'

সাজিদ আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিলো না। সে আবার গল্প বলতে শুরু করলো---

আইনষ্টাইনের এই আপেক্ষিকতার সূত্র ধরে, রাশিয়ান পদার্থবিদ আলেকজান্ডার ফ্রিদম্যান দাবি করেন যে, এই মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি একটি ক্রমবর্ধমান মহাবিশ্ব। স্যার আলেকজান্ডার ফ্রিদম্যান সাধারন ধারনা করেছিলেন বটে, কিন্তু যথেষ্ট ব্যাখ্যার অভাবে তার কথা বিজ্ঞানী মহল তখন আমলে নেয় নি। এরপর বেলজিয়ামের বিজ্ঞানি Georges Lemaître সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী মহলকে একটি শক্ত শক খাওয়ালেন। তিনি বললেন, এই মহাবিশ্ব একটি ক্ষুদ্র পরমাণু কণা, যাকে Super Atom বলা হয়, এর বিস্ফোরনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, এবং রাশিয়ান বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্রিদম্যানের সাথে সুর মিলিয়ে বললেন, মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। বলা বাহুল্য, Georges Lemaître এর এসব দাবিরও ভিত্তি ছিলো আইনষ্টাইনের আপেক্ষিকতার সেই সূত্রটি।'

মোস্তফা জিজ্ঞেস করলো,- 'Georges Lemaître এর এটিই কি আমাদের সেই Big Bang Theory?'

সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ। এটিই হলো বিগ ব্যাং থিওরি। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানিস,

বিজ্ঞানী Georges Lemaître আইনষ্টাইনের সূত্রকে ভিত্তি করে এই দাবি করলেও আইনষ্টাইন নিজেই Georges Lemaître এর এই দাবিকে নাকচ করে দেয়।'

রাব্বি বললো,- 'বলিস কি? কেনো?'

সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে, এটা আইনষ্টাইন মেনে নিতে পারে নি। তিনি বললেন, Lemaître তার ব্যাখ্যাতে ম্যাথমেটিক্যালি প্রচুর ভুল করেছেন। আইনষ্টাইন আরো বললেন, - মহাবিশ্ব অসীম হলেও এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে- এটি ভুল ব্যাখ্যা।

সে যাহোক, এই হলো বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর্গুমেন্ট। কিন্তু তাদের এই তর্কাতর্কিতে না জড়িয়ে, আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল বিজ্ঞানী মহলে একটি বোম ফাটালেন।'

আমি বললাম,- 'ও আচ্ছা, তুই বিজ্ঞানী হাবলকেই হাবলু বলেছিলি বুঝি?'

সাজিদ আবারো মুচকি হাসলো। বললো,- 'হ্যাঁ। শোন কি হলো, ১৯২০ সালে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ওরফে বিজ্ঞানি হাবলু একটি টেলিস্কোপ আবিষ্কার করে ফেললো। এই টেলিস্কোপটিই রাতারাতি পাল্টে দিলো তখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞান জগতকে। মাউণ্ট উইলসন অবজারভেটরিতে বিজ্ঞানি হাবল তাঁর আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে প্রমাণ করে দেখালেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের ছায়াপথগুলো ক্রমাগত একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি এটি প্রমান করেন Doppler Effect থিওরি দিয়ে।

Doppler Effect হলো এই- মহাবিশ্বের বস্তুগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি আলোকতরঙ্গের উপর ফেলা হয়, তাহলে তরঙ্গ যদি লাল আলোর দিকে সরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে ছায়াপথগুলো একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যদি তা না করে সেটা নীল আলোর দিকে সরে যায়, তাহলে বুঝতে হবে, ছায়াপথগুলো একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে না গিয়ে,বরং কাছাকাছি চলে আসছে। বারবার এই পরীক্ষাটি করে প্রমাণ করা হয় যে, ছায়াপথগুলো একটি অন্যটির কাছাকাছি নয়, বরং একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ১৯৫০ সালে মাঊণ্ট পালমারে সে সময়ের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ বসিয়ে এই ব্যাপারটি আরো নিখুঁতভাবে অভজার্ভ করে বিজ্ঞানিরা। হাবলের এই দাবির সাথে বিজ্ঞানি Georges Lemaître এর দাবি সম্পূর্ণ মিলে যায়। এবং সেই এক্সপেরিমেন্ট থেকে বোঝা যায়, মোটামুটি ১০-১৫ বিলিয়ন বছর আগে একটি ক্ষুদ্র কণা থেকেই আজকের মহাবিশ্বের সৃষ্টি। মজার ব্যাপার হলো, যে আইনষ্টাইন বিশ্বাস করতেন যে, মহাবিশ্ব অসীম হলেও স্থির, সম্প্রসারিত হচ্ছেনা, বিজ্ঞানি Georges Lemaître এর থিওরিকে ভুল বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই আইনষ্টাইনই পরে নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে বললেন,- 'বিজ্ঞানি হাবল এবং Georges Lemaître এর দাবিই সত্য। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

তিনি বিজ্ঞানি Georges Lemaître এর কাছে অনুতপ্ত হন এবং নিজের ভুলকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল দাবি করেন।

এখন বিজ্ঞানি মহলে এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হয়েই চলেছে আজ অদ্যাবধি।'

এতটুক বলে সাজিদ থামলো। আমরা এক নিশ্বাঃসে বিজ্ঞানের একটি মজার অধ্যায় থেকে ভ্রমণ করে এলাম। এবার সাজিদ আমাদের মধ্যে যে এগনোষ্টিক, যে বিশ্বাস করে যে, কোরান মুহাম্মদ (সাঃ) এর নিজের কথা, তার দিকে ফিরলো।

বললো,-, 'রোহান, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তোর এসব অবশ্যই জানা থাকার কথা,তাই না?'

রোহান বললো,- 'হ্যাঁ। জানি।'

- 'মাত্র গত শতাব্দীতে বসে আইনষ্টাইনও যে মহাবিশ্ব নিয়ে ভুল জানতেন, তা তো তুই জানিস, তাই না?'

- 'হ্যাঁ।'

- 'বিজ্ঞানি Georges Lemaître আর বিজ্ঞানি হাবলের আগে এই জিনিস তাবৎ দুনিয়ার কেউই জানতো না, ঠিক না?'

- 'হ্যাঁ।'- রোহানের স্বীকারোক্তি।

সাজিদ বললো,- 'আচ্ছা রোহান, আমি যদি বলি, তাদের অনেক অনেক অনেক আগে, তাদের প্রায় সাড়ে ১৩০০ বছর আগে একজন ব্যক্তি এসব কথা বলেছে, তুই বিলিভ করবি?'

রোহান চিৎকার করে বললো,- 'Impossible, Quite Impossible... '

সাজিদ তখন বললো,- 'শোন রোহান, কোরানের সূরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নাম্বার আয়াতে আছে 'আমরা নিজ হাতে আসমানকে সৃষ্টি করেছি এবং এটাকে সম্প্রসারিত করে চলেছি।'

এখানে আয়াতের শেষে আসমানের সম্প্রসারণ বুঝাতে যে 'মূসিঊন' শব্দ আছে, সেটি একটি সক্রিয় বিশেষণ। চলমান ক্রিয়া নির্দেশক, যা নির্দেশ করে কোন কাজ অতীতকাল থেকে শুরু হয়ে বর্তমান অবধি চলছে এবং ভবিষ্যতেও তা হয়ে চলবে। অর্থাৎ, আল্লাহ বলছেন, তিনি মহাবিশ্বকে (এখানে আসমান = মহাবিশ্ব) নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন, এবং সেটাকে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করেই চলেছেন। ঠিক এই কথাগুলোই বিজ্ঞানি Georges Lemaître এবং বিজ্ঞানি হাবল আমাদের গত শতাব্দীতে জানিয়েছেন।

বল তো, আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে, মরুভূমিতে উট চড়ানো এক বালক এমন একটি কথা কিভাবে বললো, যা আধুনিক বিজ্ঞান প্রমান করেছে মাত্র ১৯২৯ সালে?

এই কথা না বাইবেলে ছিলো না ইঞ্জিলে। না ছিলো কোন গ্রিক পুরাণে, না কোন মিথোলজিতে। মহাকাশের এমন একটি রহস্যময় ব্যাপার মক্কার একজন নিরক্ষর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন লোক মুহাম্মদ (সাঃ) কোথায় পেলেন? বল তো?'

অন্যান্য সময় হলে রোহান বলতো, মুহাম্মদ বাইবেল থেকে চুরি করেছে, নয়তো বলতো কোন গ্রিক পুরাণ থেকে মেরে দিয়েছে, কিন্তু সাজিদের বিস্তারিত গল্প শোনার পর তার এই দাবি যে ধোপে টিকবেনা, সে সেটা বুঝতে পারলো।

সাজিদ বললো,- ' এটা কি সম্ভব নিরক্ষর মুহাম্মদ (সাঃ) এর দ্বারা যদি কোন ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ তাতে না থাকে?'

রোহান মাথা নিঁচু করে বললো,- 'নাহ।'

সাজিদ বললো,- 'তাহলে প্রমাণ হলো, কোরান মুহাম্মদ (সাঃ) এর লেখা নয়, এটি একটি ঐশ্বরিক কিতাব, যা নাজিল হয়েছে মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর।'

রোহান কিছু বললো না। তাকে কিছুটা চিন্তিত দেখালো। সম্ভবত সে বুঝতে পেরেছে যে, চোরের দশদিন, গেরস্থের একদিন।

রেফারেন্সঃ
১/ সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৪৭
২/ A word for word meaning of holy Quran by Mohammad Mohar Ali
৩/ Wikipedia