মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah

প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ - আরিফ আজাদ · অধ্যায় ১৩/২০

(১৩) রাসূল (সাঃ) আর আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে নিয়ে কথিত নাস্তিকদের কানাঘুষা

রাসূল (সাঃ) আর আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে নিয়ে কথিত নাস্তিকদের কানাঘুষা

আমরা চারজন বসে টি.এস.সি তে আড্ডা দিচ্ছিলাম। রাকিব, শাহরিয়ার, সাজিদ আর আমি।

আমাদের মধ্যে শাহরিয়ার হলো খেলাপ্রেমিক। ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার চরম ভক্ত। কেউ পুরো সপ্তাহে কোন ম্যাচ না দেখে শাহরিয়ারের কাছে আধঘণ্টা বসলেই হবে। শাহরিয়ার পুরো সপ্তাহের খেলার আদ্যোপান্ত তাকে কাগজে-কলমে বুঝিয়ে দেবে। ইপিএলে কোন দল টপে আছে, ম্যানচেষ্টার সিটির দায়িত্ব নিয়ে পেপ গার্দিওলা কিরকম দলটাকে পাল্টে দিলো, সিরিএ-তে জুভের অবস্থান কোথায়, ইব্রা'কে ছেড়ে দিয়ে ফ্রেঞ্চলীগে পিএসজির অবস্থা কেমন, বুন্দেসলীগাতে বায়ার্ন আর ডর্টমুন্ড কি করছে, লা-লীগাতে বার্সা-রিয়ালের দৌঁড়ে কে এগিয়ে, রোনালদোর ফর্ম নাই কেনো, মেসিকে ছাড়া বার্সা সামনের ম্যাচগুলা উতরে যেতে পারবে কি না, নেইমার সেরা না বেল, সুয়ারেজ নাকি বেনজেমা ইত্যাদি ইত্যাদি বিশ্লেষণের জন্য শাহরিয়ারের জুড়ি নেই। এত কঠিন কঠিন স্প্যানিশ, জার্মেইন, ফ্রেঞ্চ আর ইতালির নামগুলো সে কিভাবে যে মনে রাখে আল্লাহ মালুম। খেলার খবর বলতে শুরু করলে তার আর থামাথামি নেই। ননষ্টপ বলে যেতে পারে। এইজন্যে আমাদের বন্ধুমহলে শাহরিয়ার 'স্পোর্টস চ্যানেল' নামে পরিচিত।

রাকিব হলো আগাগোড়া 'পলিটিক্স স্পেশালিষ্ট'। দুনিয়ার রাজনীতি কখন কোথায় কিভাবে মোড় নিচ্ছে তার সমস্তরকম আপডেট থাকে রাকিবের কাছে। গুলির মুখ থেকে ট্রাম্পের বেঁচে আসা থেকে শুরু করে হিলারির ম্যালেরিয়া পর্যন্ত সব খবর তার নখদর্পণে। তবে, ইদানিং সে ব্যস্ত 'পাক-ভারত' যুদ্ধ নিয়ে। কাশ্মীরের ঊরিতে হামলা নিয়ে পাক-ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বিরাজ করছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই যাচ্ছে সে। রাকিব মনে করছে, ঊরি'র হামলাটা আসলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি 'ব্লাইন্ড গেম'। তার মতে, ঊরি'তে যারা হামলা করেছে তারা যদি সত্যিই পাকিস্তানি হবে, তাহলে নিহত হামলাকারীদের মিডিয়ার সামনে না এনে রাতারাতি কবরস্থ করে ফেলা হলো কেনো? সেই হামলাকারীদের ছবি আর পরিচয় মিডিয়ার সামনে এনে পাকিস্তানকে একঘরে করে দেবার একটি দারুন চান্স ছিলো ভারতের হাতে। কিন্তু ভারত তা করলো না কেনো? কেন তারা রাতারাতি লাশগুলো সেনা ক্যাম্পেই দাফন করে ফেললো? কেনো পাকিস্তানের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হলো না ইত্যাদি পয়েণ্ট ধরে রাকিবের মনে সন্দেহ আছে।

যুদ্ধ যদি সত্যি লেগেই যায়, কোন পক্ষ বেনিফিটেড হবে, কার কতো সামরিক শক্তি, কে কোনদিক থেকে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চালাবে সেগুলোরও পয়েণ্ট বাই পয়েণ্ট ব্যাখ্যা দিচ্ছে সে।

আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ নিলয় দা'র আগমন। নিলয় দা আমাদের চেয়ে সিনিয়র মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র ছিলো।
আমাদের চেয়ে ঢের সিনিয়র হওয়া সত্বেও আমাদের সাথে তার বন্ধুত্বসুলভ আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই যে নিলয় দা এত সিনিয়র লেভেলের কেউ।

তার হাতে একটি পত্রিকা। পত্রিকা হাতে নিলয় দা আমাদের পাশে এসে বেঞ্চিতে বসলো।

নিলয় দা'কে দেখে সাজিদ আরেক কাপ রঙ চা'র অর্ডার করলো।
চা চলে এলে নিলয় দা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো,- 'বাক স্বাধীণতার মূল্য পৃথিবীর কোথাও নেই, বুঝলি? কোথাও নেই।'
কথাগুলো এমনভাবে বললো যে, নিলয় দা'কে খুব মর্মাহত দেখালো। নিলয় দা কোন পয়েণ্ট থেকে কথাগুলো বললো তা আমাদের কারো মাথাতে আসে নি তখনও। রাকিব বলে উঠলো,- 'নিলয় দা কি পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় কটুক্তির দায়ে গ্রেফতার হওয়া তারক বিশ্বাসের কথা বললে?'

নিলয় দা রাকিবের কথার প্রতুত্তরে কোনকিছু বললো না। তার মানে রাকিবের ধারনা ঠিক। অন্য সময় হলে রাকিবের এরকম উপস্থিত বুদ্ধির বহর দেখে নিলয় দা তার পিট চাপড়ে দিয়ে বলতো 'সাবাশ'। কিন্তু আজ খুব ফ্রাষ্টেটেড থাকায় নিলয় দা খুব অফ মুডে আছে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাপারটা খুব শর্টলি ব্যাখ্যা করলো রাকিব। পশ্চিমবঙ্গের এক নাস্তিক তরুণ, মহানবী (সাঃ) কে নিয়ে কটুক্তি করার ফলে সাইবার আইনে গ্রেফতার হয়েছে পরশুদিন। এটাকে নিলয় দা বলছে বাক স্বাধীণতার উপর আঘাত।

সাজিদ তার চা'য়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললো,- 'এতে দোষের তো কিছু দেখছিনা দাদা। ছেলেটা দোষ করেছে, সে তার শাস্তি পাচ্ছে। What's wrong?'

নিলয় দা মুখের রঙ পরিবর্তন করে বড় বড় চোখে সাজিদের দিকে তাকালো। বললো,- 'একজন পঞ্চাশোর্ধ বুড়া লোক ৯ বছর বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ে করলে দোষ নেই, তা নিয়ে কথা বললেই দোষ হয়ে যায়?'

সাজিদ বললো,- 'কথা বললে তো দোষ নেই দাদা, কিন্তু অশ্লীল ভাষায় কটুক্তি করাটা দোষের। একটি ধর্মের পবিত্র নবিকে নিয়ে এরকম খিস্তি করাটা মূল্যবোধ বিরোধি তো বটেই, এটা সংবিধান বিরোধিও।'

- 'গোষ্ঠি কিলাই তোমার এরকম মূল্যবোধ আর সংবিধানের।'

সাজিদ বুঝলো নিলয় দা খুব ক্ষেপে আছে। তাকে সহজে বোঝানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

সাজিদ বললো,- 'দাদা, মনে আছে তোমার? আমি তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তোমার সাথেও প্রথম পরিচয় হয় তখন। এক সন্ধ্যায় হুমায়ুন আহমেদের মেয়ের বয়েসী শাওনকে বিয়ে করার ব্যাপারটা নিয়ে যখন আমি আপত্তি তুলেছিলাম, তুমি কি বলেছিলে? তুমি বলেছিলে,- 'বিয়ে হলো একটি বৈধ সামাজিক বন্ধন। যখন তাতে দুটি পক্ষের সম্মতি থাকে, তখন সেখানে বয়স, সামাজিক ষ্ট্যাটাস কোনকিছুই ম্যাটার করে না। হুমায়ুন আহমেদের বেলায় যে কথাগুলো প্রযোজ্য, সে কথাগুলো মুহাম্মদ (সাঃ) এর বেলায় কেনো প্রযোজ্য হবে না?'

নিলয় দা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। এরপর বললো,- 'তাই বলে বলতে চাচ্ছিস, ৯ বছরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাবে?'

সাজিদ হাসলো। বললো,- 'দাদা, আমি মোটেও তা বলছি না। আমি প্রথমে বোঝাতে চাইলাম যে, বিয়ে একটা সামাজিক বন্ধন।'

- 'তো? সামাজিক বন্ধন ধরে রাখতে ৯ বছরের কিশোরি বিয়ে করতে হবে নাকি?'

সাজিদ উঠে দাঁড়ালো। আমি জানি এখন সে লেকচার শুরু করবে। রাসূল (সাঃ) এবং আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ লেকচার দেওয়ার জন্য সে ম্যাণ্টালি প্রস্তুতি নিচ্ছে।

যা ভাবলাম তাই। সাজিদ বলতে শুরু করলোঃ

'দাদা, প্রথমে বলে রাখি, যারাই রাসূল (সাঃ) আর আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে নিয়ে আপত্তি তুলে, তাদের প্রথম দাবি- মুহাম্মদ (সাঃ) নাকি যৌন লালসায় কাতর ছিলেন। সেজন্যে তিনি নাকি কিশোরি আয়েশা (রাঃ) কে বিয়ে করেছিলেন।

তাদের এই দাবি যে কতোটা বাতুলতা আর ভিত্তিহীন, তা ইতিহাস থেকে আমরা দেখবো। আমরা জানি, মুহাম্মদ (সাঃ) বিয়ে করেছিলেন ২৫ বছর বয়সে। হজরত খাদিজা (রাঃ) কে।

বলা বাহুল্য, যখন মুহাম্মদ (সাঃ) ২৫ বছরের একজন টগবগে তরুণ, ঠিক সেই সময়ে তিনি বিয়ে করলেন চল্লিশোর্ধ একজন মহিলাকে, যিনি কিনা আবার একজন বিধবা ছিলেন। খাদিজা (রাঃ) যতোদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন মুহাম্মদ (সাঃ) আর কোন বিয়ে করেন নি। খাদিজা (রাঃ) এর গর্ভেই মুহাম্মদ (সাঃ) অধিকাংশ সন্তান-সন্তনি জন্মগ্রহণ করেছিলো। বলো তো দাদা, তোমাদের ভাষায় যিনি একজন যৌন কাতর মানুষ, তিনি কেন তার পুরো যৌবনকাল একজন বয়স্ক, বয়োবৃদ্ধা মহিলার সাথে কাটিয়ে দিলেন?

তুমি হয়তো বলবে, খাদিজা (রাঃ) এর প্রচুর ধন-সম্পত্তি ছিলো। পাছে এগুলো হারানোর ভয়ে হয়তো তিনি আর বিয়ে করেন নি। তোমার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এটা ইতিহাসম্মত যে, সম্পদশালী খাদিজা (রাঃ) নিজেই মুহাম্মদ (সাঃ) কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, মুহাম্মদ (সাঃ) নিজ থেকে দেন নি। তারউপর, খাদিজা (রাঃ) নিজেই যেখানে একজন বিধবা ছিলেন, সেখানে মুহাম্মদ (সাঃ) ও যদি সেই অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করতে চাইতেন, তাতে বাঁধা দেওয়ার অধিকার খাদিজা (রাঃ) এর থাকার কথা না।

তাহলে এখান থেকে আমরা কি বুঝলাম? আমরা বুঝলাম যে, মুহাম্মদ (সাঃ) যৌন কাতরতা থেকে কিশোরি আয়েশা (রাঃ) কে বিয়ে করেন নি।
নিলয় দা প্রশ্ন করলো,- 'তাহলে কিশোরি আয়েশা কে বিয়ে করার হেতু কি?'

সাজিদ বললো,- 'Let me finish... আয়েশা (রাঃ) কে বিয়ে করার একটা হুকুম রাসূল (সাঃ) আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কারন, জ্ঞানে-গুণে আয়েশা (রাঃ) ছিলেন তৎকালীন আরব কন্যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা। তার সেই প্রজ্ঞা, সেই জ্ঞান, সেই বিচক্ষণতা যাতে পুরোপুরিভাবে ইসলামের কল্যাণার্থে ব্যবহার হতে পারে, তারজন্য হয়তো এই হুকুম।'

স্পোর্টস চ্যানেল শাহরিয়ার এতক্ষণ চুপ করে ছিলো। এবার সে বললো,- 'সাজিদ, 'রাসুল (সাঃ) আয়েশা (রাঃ) কে বিয়ে করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম প্রাপ্ত' এই কথার ভিত্তি কি?'

সাজিদ শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললো,- 'নবিদের স্বপ্নও একপ্রকার ওহি, এটা জানিস তো?'

- 'হ্যাঁ।'

- 'বুখারির হাদীসে আছে, রাসূল (সাঃ) হজরত আয়েশা (রাঃ) কে একবার বললেন,- ' (হে আয়েশা) আমি তোমাকে দুইবার স্বপ্নে দেখেছিলাম। একটি রেশমের উপরে একটি কারো একজনের মুখচিহ্ন। আমি যখন রেশমের উপর থেকে আবরণ সরালাম, আমি দেখলাম সেটা তোমার মুখাবয়ব। তখন কেউ একজন আমাকে বললো,- ' (হে মুহাম্মদ) এটা তোমার স্ত্রী।' আমি বললাম, যদি এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়, তাহলে এটাই হবে।'

বুখারির এই হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আয়েশা (রাঃ) যে নবি মুহাম্মদ (সাঃ) স্ত্রী হবে, সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই একটি সম্মতি।'

শাহরিয়ার আবার বললো,- 'কিন্তু তুই যে বললি, তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইসলামের কল্যাণার্থে ব্যবহারের জন্যই এই হুকুম, তার দলিল কি?'

সাজিদ বললো,- 'এটা তো সর্বজনবিদিত সত্য কথা। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) এর পর সবচে যিনি বেশি হাদীস মুখস্থ রেখেছিলেন, তিনি হজরত আয়েশা (রাঃ)। শুধু তাই নয়, আয়েশা (রাঃ) এর ছিলো কোরানের অগাধ পান্ডিত্য। এমনকি বড় বড় সাহাবিরা পর্যন্ত তাঁর কাছে ফতোয়ার জন্য আসতো। তাঁর ফিক্বহী জ্ঞান ছিলো অসামান্য।

আবু মূসা আল আনসারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,- 'এমন কখনো হয়নি (ফিক্বহী বিষয়ে) আমরা কোনকিছুর সমাধানের জন্য আয়েশা (রাঃ) এর কাছে গেলাম কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাইনি।'

অর্থাৎ, আয়েশা (রাঃ) এর এই যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এরজন্য তিনি আল্লাহ কর্তৃক উম্মুল মুমিনীন হিসেবে সিলেক্টেড হয়ে যান।'

এছাড়াও, তৎকালীন আরবে খুব ছোট বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো। তখনকার প্রেক্ষাপট ছিলো ভিন্ন। এটা ঠিক, যুগের সাথে সাথে সেটা পাল্টিয়েছে। এখন মেয়েদের অনেক চিন্তা। ক্যারিয়ার গড়ো, পড়াশুনা করো, বিদেশ যাও, উচ্চ ডিগ্রির সার্টিফিকেট নাও।

তখন আরবের মেয়েদের চাকরি করার দরকার হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ার রীতি তখনও ছিলো না। ঘরোয়া পরিবেশে তারা ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করতো। এরজন্য, খুব ছোট বয়সেই তাদের বিয়ের রীতি ছিলো।

তখন মেয়েদের ছোট বয়সেই যে বিয়ের রীতি ছিলো, তা আয়েশা (রাঃ) এর জীবনের আরেকটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে বিয়ের আগে আয়েশা (রাঃ) এর আরেকজনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। তার নাম ছিলো জুবায়ের। কিন্তু, আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করায় এই বিয়েটা ভেঙ্গে যায়। এর থেকে কি প্রমাণ হয়না তখন মেয়েদের ছোট বয়সেই বিয়ের প্রচলন ছিলো? তাছাড়া, তখনকার মক্কার কোন বিধর্মীরা এই বিয়ে নিয়ে আপত্তি তুলে নি। তারাও জানতো, এটা খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।

নিলয় দা বললো,- 'মুহাম্মদ তো এসেছিলেন রীতি ভেঙ্গে রীতি গড়ার জন্য। তিনি এই অদ্ভুত রীতি ভাঙলেন না কেনো?'

সাজিদ বললো,- 'দাদা, ঠিক বলেছো। মুহাম্মদ (সাঃ) এসেছিলেন রীতি ভেঙে রীতি গড়ার জন্য। কিন্তু তিনি সেসব রীতি ভাঙার জন্য এসেছিলেন, যা অনৈতিক, যেমন কন্যা শিশুকে জীবন্ত দাফন। তিনি আরবের সেসব কালচার পাল্টে দিয়েছেন, যা জাহেলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু, ছোট বয়সে বিয়ে সেরকম কোন ব্যাপার নয়। বিজ্ঞান আমাদের বলে, মেয়েরা পুরুষের চেয়ে দশগুণ তাড়াতাড়ি ম্যাচিউর হয়। সেটা ফিজিক্যালি এবং ম্যাণ্টালি দুইভাবেই। তাছাড়া, তখনকার আরবে ছোট বয়সে বিয়ে হবার পরও মেয়েরা খুব নরম্যালিই সন্তান জন্ম দিতো। এটা কোন সমস্যা ছিলো না। মুহাম্মদ (সাঃ) এর এটা চেঞ্জ করার তো দরকার ছিলোই না। যা দরকার ছিলো, তা তিনি করেছেন। তুমি কি আশা করছো যে, মুহাম্মদ (সাঃ) কেনো তৎকালীন আরবদের উটের ব্যবসা তুলে দিয়ে তাদের শেয়ার ব্যবসা শেখালেন না, কেন তিনি খেঁজুরের ব্যবসা তুলে দিয়ে সেখানে চকোলেট আর রসমালাইয়ের ব্যবসার প্রচলন করলেন না? তুমি হয়তো ভাবছো, তৎকালীন আরবের বালকদের উট চরানো থেকে মুক্তি দিয়ে কেনো মুহাম্মদ (সাঃ) তাদের হাতে একটি করে কম্পিউটার এবং একটি করে ফেইসবুক এ্যাকাঊণ্ট খুলে দিলেন না?'

সাজিদের কথা শুনে আমি, রাকিব আর শাহরিয়ার হা হা হা হা করে হাসতে লাগলাম। সাজিদ বললো, - মানুষ মাত্রই তাঁর সমাজের সুস্থ নিয়মগুলোর সাথে মিলিয়ে চলতে বাধ্য। মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না দাদা। তাছাড়া, এত অল্প বয়সে বিয়ে কেবল ১৫০০ বছর আগে ছিলো তা নয়, শিল্পবিপ্লবের পরেও অনেক উন্নত দেশে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১০ এর নিচে ছিলো।

তাছাড়া, ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদ (সাঃ) এর আরো ৫০০ বছর পরে, ইংল্যান্ডের রাজা জন ৪৪ বছর বয়সে ১২ বছর বয়সী রানী ঈসাবেলাকে বিয়ে করেছিলেন। এ ব্যাপারগুলো তখনকার সমাজে, যুগে খুব স্বাভাবিক ছিলো, যেমন স্বাভাবিক সঙ্গম করে সন্তান উৎপাদন করা। তাছাড়া, উপমহাদেশেও যে খুব ছোট বয়সে বিয়ের একটি রীতি ছিলো, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প 'হৈমন্তি' থেকেই আমরা দেখতে পাই। লেখক সেখানে দেখিয়েছেন, তখনকার সময়ে ৮ থেকে ১১ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে হতো। হৈমন্তির বিয়ের স্বাভাবিক বয়স পেরিয়ে যাওয়ায়, অর্থাৎ, ১৭ হয়ে যাওয়ায় তার শ্বাশুড়ি সেটা সবার কাছ থেকে লুকোতে চাইছিলেন। হৈমন্তিকেও মিথ্যে বলার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের সময়েও ৮ থেকে ১১ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে ছিলো একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

সেই গল্পে আমরা 'পণপ্রথা'র কুফল সম্পর্কে একটি আভাস পেলেও, কোথাও কিন্তু বিয়ের বয়স নিয়ে উচ্চবাক্য দেখিনি। বরং, হৈমন্তির বয়স বেশি হয়ে যাওয়াতেই কিছুটা আপত্তি দেখা গেছে। এখান থেকে বুঝতে পারি, রবীন্দ্র আমলেও ছোট বয়সে বিয়ের একটি প্রচলন ভারতবর্ষেই মজুদ ছিলো।

সাজিদের এই লেকচারে নিলয় দা সন্তুষ্ট না। বললো,- 'দ্যাখো ভাই, যতোই ত্যানা পেঁচাও, একজন বয়োবৃদ্ধ লোক একজন ৯ বছর বয়েসি কিশোরিকে বিয়ে করেছে, এটাকে তুমি কোনভাবেই ডিফেন্ড করতে পারো না। সে প্রফেট হোক আর যাই-ই হোক।

আমি ভাবলাম, এইবার সাজিদ পরাজিত হবে। হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ গলায় বলবে,- 'নাহ! আর পারলাম না দাদা।'

কিন্তু না। সাজিদের মধ্যে আমি তেমন কিছুই দেখলাম না। সে খুব স্বাভাবিক। মুচকি একটি হাসির রেখা তার ঠোঁটে। সে আরেক কাপ চা'য়ের অর্ডার করলো।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো,- 'দাদা, ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে পদ পেয়েছো শুনলাম।'

নিলয় দা বললো,- 'হুম, সাহিত্য সম্পাদক।'

সাজিদ বললো,- 'নতুন একটি আইন হলো শুনলাম। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার নিয়ে কেউ কটুক্তি করলেই ধরা হবে নাকি?'

- 'হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করলে তো সেটা সহ্য করা হবে না।'

- 'তা ঠিক। বঙ্গবন্ধু তো তোমাদের আইডল।'

নিলয় দা বললো, - 'আমাদের আইডল কি রে? বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির আইডল।'

- 'জ্বি, সেটাই দাদা। আচ্ছা দাদা, তুমি জানো, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর নাম কি ছিলো?'

নিলয় দা অবাক হবার ভঙ্গি করে বললো,- 'কিসব বলছিস তুই? জানবো না কেনো? বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা বেগম।'

সাজিদ বললো,- 'দাদা, তুমি জানো, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা'র জন্ম কোন সালে?'

নিলয় দা কিছুক্ষণ ভাবলেন। বললেন, - 'ভুলে গেছি রে! বিসিএসের জন্য যখন প্রিপারেশান নিচ্ছিলাম, তখন পড়েছিলাম।'

সাজিদ তার ফোন বের করে সেখান থেকে উইকিপিডিয়ায় 'বেগম ফজিলাতুন্নেসা' লিখে সার্চ দিলো। উইকিপিডিয়া রেজাল্ট দেখালো বেগম ফজিলাতুন্নেসা'র জন্ম ১৯৩০ সালে। সাজিদ সেটা নিলয় দা'কে দেখালো।
নিলয় দা বললো,- 'হুম, মনে পড়েছে। কিন্তু তাতে কি হয়েছে? হঠাৎ এই ব্যাপারে চলে গেলি কেনো?'

সাজিদ বললো,- 'দাদা, তুমি জানো, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা'র সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কতো সালে বিয়ে হয়?'

নিলয় দা 'না' সূচক মাথা নাড়লো। সাজিদ আবার উইকি থেকে দেখালো। বঙ্গবন্ধুর সাথে বেগম ফজিলাতুন্নেসা'র বিয়ে হয় ১৯৩৮ সালে।

সাজিদ বললো,- ' দাদা, ১৯৩৮ থেকে ১৯৩০ বাদ দিলে কতো থাকে?'

নিলয় দা বললো,- ' ৮ '...

সাজিদ বললো,- 'জ্বি দাদা, একদম ঠিক বলেছো। ১৯৩৮ থেকে ১৯৩০ বাদ দিলে থাকে ৮। ঠিক ৮ বছর বয়সের বেগম ফজিলাতুন্নেসা'র সাথে বঙ্গবন্ধুর বিয়ে হয়। আচ্ছা দাদা, আমি কি এটাকে বাল্য বিবাহ বলতে পারবো? বলতে পারবো, শেখ মুজিব একজন যৌন কাতর পুরুষ ছিলেন যার ফলে তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সের ফজিলাতুন্নেসাকে বিয়ে করেছেন? আমি এরকম বললে আমার বিরুদ্ধে কি মামলা হওয়া উচিত দাদা?

বলো তো, একবিংশ শতাব্দীর শেখ মুজিবুর রহমান যেটা পেরেছেন, মাত্র ৮ বছর বয়েসী একজন কিশোরিকে বিয়ে করে এতগুলো সন্তান জন্ম দিতে পারলে ১৫০০ বছর আগের মুহাম্মদ (সাঃ) কেনো পারবে না? কেন তাকে ধর্ষক, যৌন কাতর, যৌন লিপ্সু ডাকা হবে? তাঁকে এবং আয়েশা (রাঃ) কে নিয়ে অশ্লীল কথা লিখে কেউ আইনের জালে ফাঁসলে তাঁর জন্য কেনো তোমার মন কাঁদবে যেখানে তুমি শেখ মুজিবের জন্য তৈরি করে রেখেছো সাইবার আইন?'

আকাশ থেকে পড়লে যা হয়, নিলয় দা'র অবস্থাও তখন তেমন। নিলয় দা এরকম একটা জবাব পাবেন তা হয়তো কল্পনাও করে নি।

-
চা'য়ের বিল দেওয়ার জন্য সাজিদ এগিয়ে গেলো। গম্ভীর, রাজনীতিপ্রিয় রাকিব এসে বললো,- 'দোস্ত, পরানটা ঠান্ডা করে দিয়েছিস একদম। বিলটা আমায় দিতে দে, প্লিজ?'
সাজিদ মুচকি হাসলো।

রেফারেন্সঃ
1/Jala-Ul Afhaam by Imam Ibnul Qaiyum
2/Sahih Al bukhari, volume 5, book 58, hadith 234
3/ 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'- শেখ মুজিবুর রহমান
4/ Wikipedia

বিঃদ্রঃ (শেখ মুজিব বা উনার স্ত্রীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আমার মোটিভ নয়। একটি যুক্তির খাতিরেই উনাকে উদাহরণ হিসেবে টানা হয়েছে। কেউ এটাকে পলিটিক্যালি বা পারসোনাল এ্যাটাক মনে করে ভুল করবেন না।)