মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
প্রবন্ধ

চিকিৎসা নিতে কেন বিদেশমুখী

৫ মিনিটে পড়ুন১ জানুয়ারি ২০২২
চিকিৎসা নিতে কেন বিদেশমুখী
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার খুব করুন অবস্থা৷ ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে এখনো চিকিৎসা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য সেবা অপ্রতুল৷ ঢাকা ও জেলা শহরগুলোর হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসক, সেবিকা ও টেকনিশিয়ানের অভাব, আইসিইউ ও মেডিকেল সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততার নানা চিত্র পাওয়া যায়৷ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান ভালো না৷ এখানে মানুষকে চিকিৎসা সেবা পেতে পদে পদে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়৷ এখানে যেমন চিকিৎসক এবং হাসপতালের বেড প্রয়োজনের তুললায় অনেক কম, তেমনি রোগ নির্নয়ের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই৷ ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো চাইলেও রোগীদের ঠিকমতো চিকিৎসা দিতে পারেনা৷ প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন হয়৷

সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালেই সময় দেন বেশি৷ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অনেক চড়া হলেও সে অনুসারে সেবা পাওয়া যায় না৷ চিকিৎসা ব্যয় অনেক চড়া হবার কারণে সবার পক্ষে তাই সেই সেবা নেয়া সম্ভব হয়না৷

৬৭টি দেশের ওপর করা গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলছে, চিকিৎসকেরা একজন রোগীর পেছনে গড়ে ৪৮ সেকেন্ড সময় দেন।

বাংলাদেশে চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানির মধ্যকার সম্পর্কে দেখা যায়, ওষুধ কোম্পানিগুলো নগদ অর্থ, ভ্রমণ, ওয়ার্কশপের স্পন্সর, চেম্বার সাজানো, ওষুধের স্যাম্পল, পেশাগত বা পেশাবহির্ভূত নানা উপহার চিকিৎসকদের দিচ্ছে৷ চিকিৎসকরা ও অনেক সময় এই ওষুধ কোম্পানিগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রোগীদেরকে এমন সব ঔষধ এবং পরীক্ষা দিচ্ছেন যা ওই রোগীর জন্য অপ্রয়োজনীয়৷ ওষুধ কোম্পানিগুলোর কথামতো ঔষধ না দিলে অনেক সময় অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে৷
নেত্রকোনায় রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে কোম্পানির ওষুধ না লেখায় বিক্রয় প্রতিনিধির হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন চিকিৎসক মেহেদী হাসান।

বাংলাদেশের সাস্থখাতে প্রচুর দুর্নীতি হচ্ছে। বেক্সিমকোর মালিক সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে অথচ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা সরকার সরাসরি নিজে না এনে বেক্সিমকোর মাধ্যমে এনে সরবরাহ করেছে। ফলে এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে।

উন্নত চিকিৎসার অভাবে এবং ভুল চিকিৎসার শিকার হওয়ার ভয়ে প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালগুলোর দিকে ছুটছেন৷ প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয়ে বিদেশে যাচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা৷ কিছুটা ভালো চিকিৎসার আশায় মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে অথচ করোনার গত দুই বছরে আমরা দেখতে পেরেছি পৃথিবীর তথাকথিত অনেক উন্নত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার কি নাজুক অবস্থা৷ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারতসহ অনেক দেশে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর এর অভাবে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে৷ যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বোচ্চ আট লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৃহৎ জিডিপি এবং তথাকথিত মেগা প্রকল্পগুলিকে স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো মানুষের মৌলিক অধিকারের উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রাথমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম যেমন পিপিই এবং ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মাস্ক বা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ-ভেন্টিলেটর তাদের উন্নয়নের তত্ত্বগুলিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। বিশ্বব্যাপী, মানবজাতির যত্ন নিতে পারে এমন একটি আদর্শ হিসাবে পুঁজিবাদের প্রতি আস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে।

এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সব কিছু নিয়ে ব্যবসা করতে চায়। তাই মানুষের মানুষের অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থখাত নিয়ে ও ব্যবসা করতে চাচ্ছে। বর্তমানে মানুষের অতি প্রয়োজনীয় করোনার টিকা বিতরন নিয়ে ব্যবসার চিন্তা পুজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ জীবন ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হল দুর্নীতিবাজ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন শাসক উৎপাদনের কারখানা। আমাদের দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা দেশপ্রেমের বুলি বাতলায় কিন্তু দেশের এই ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তাদের কোনো রকম প্রচেষ্টা নাই। অথচ তারা নিজেরা যেকোনো চিকিৎসার জন্য নির্লজ্জের মতো বিদেশে চলে যায়।

২০১৬ সালে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেব’। অথচ তিনি আমেরিকায় নিয়মিতভাবে নাক, কান, গলার চেকআপ করান। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কিছু করেননি বরং সৌদি আরবের কিং ফাহাদ হাসপাতালে নিয়মিতভাবে চিকিৎসা করাতেন। এখন আমরা দেখতে পারছি, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর আন্দোলন। জনগণের হাজারো সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে কত নির্লজ্জ হলে একটি দল শুধুমাত্র তাদের নেত্রীর উন্নত চিকিৎসার জন্য আন্দোলন করতে পারে তা আমরা এমন ধর্মনিরপেক্ষ দল ও শাসকদের কাজের মাধ্যমে দেখতে পাই।

পুঁজিবাদ চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাকেও বেসরকারীকরণের মাধ্যমে মানুষের কষ্টকে আরো বাড়িয়ে তোলে। তাই এ ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে ন্যায়নিষ্ঠ আল্লাহর ব্যবস্থা খিলাফতকে গ্রহণ করতে হবে।

ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত ব্যবস্থার প্রধান খলিফা তার জনগণের উপর দায়িত্বশীল। তাদের বিষয়গুলি দেখাশোনা করা এবং তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব। খলিফা প্রযাপ্ত পরিমান হাসপাতাল, ডাক্তার নিয়োগ দিবে এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও মেডিসিন এর ব্যবস্থা করবে।

“তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল বা দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্ত লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। শাসকও রাখাল বা দায়িত্বশীল, তাকে তার অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।“ (বুখারী: ৮৯৩, ৫১৮৮)

"ইমাম (খলিফা) অভিভাবক এবং তিনি তার নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল" [বুখারি ও মুসলিম]


খিলাফত ব্যবস্থা ভালো হাসপাতাল তৈরি এবং তাদের চাহিদা পূরণে সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিলো। এর একটি উদাহরণ হল যে ১১৬০ সালে বিমারস্তান (অর্থাৎ হাসপাতাল) দামেস্কে নূর আল-দীন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা তিন শতাব্দী ধরে চলে, রোগীদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করেছিল এবং বিনা খরচে ওষুধ সরবরাহ করেছিল। গোমার, নেপোলিয়নের একজন পণ্ডিত, তিনি বিমারস্তান সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন যে: “গরীব এবং ধনী নির্বিশেষে সকল অসুস্থ মানুষ বিমারস্তান (অর্থাৎ হাসপাতালে) এ যেত। সব জায়গা থেকে ডাক্তার নিয়োগ করা হয়েছিল এবং তাদের ভাল বেতন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে একটি ফার্মেসি ছিল যেখানে ওষুধ ও যন্ত্রের মজুদ থাকতো। প্রত্যেক রোগীর সেবা করছিলেন দুজন নার্সিং কর্মী। যাদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি রয়েছে তাদের একটি পৃথক বিভাগে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাদেরকে অন্যান্য সেবার সাথে গল্প বলার মাধ্যমে বিনোদিত রাখা হতো। শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা থেকে যারা সুস্থ হতেন তারা পুনর্বাসন বিভাগে কিছু সময় ব্যয় করতেন। ডিসচার্জ করার সময়, প্রতিটি রোগীকে পাঁচ টুকরো সোনা দেওয়া হত যাতে রোগীর চলে যাওয়ার সাথে সাথে কাজ করার প্রয়োজন না হয়”।

খিলাফত ব্যবস্থায় কপিরাইট রাখা অনুমোদিত নয়। ফলে অনেক দামী ঔষধের দাম কমে যাবে এবং মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে। খিলাফত রাষ্ট্র গবেষণার জন্য প্রযাপ্ত ল্যাবরেটরির এবং অর্থের ব্যবস্থা করবে। খলিফা নিজস্ব দায়িত্বে বিভিন্ন ঔষধের প্রতিষেধক তৈরী করবে এবং বিনামুল্যে করোনার টিকাসহ বিভিন্ন অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করবে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা মহান আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। তবে একটি রোগ আছে যার কোনো প্রতিষেধক নেই, সেটি হলো বার্ধক্য। -আবু দাউদ

খিলাফত রাষ্ট্র বায়তুল-মাল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাধ্যতামূলকভাবে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিককে বিনামূল্যে সমস্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করবে।

খিলাফাহ গরীব এবং ধনীর মধ্যে পার্থক্য করবে না এবং সমাজের প্রত্যেক নাগরিকদের সমস্ত প্রকার মৌলিক চাহিদা প্রদানের জন্য কাজ করবে।

তাই খিলাফত রাষ্ট্রে মানুষকে ভালো চিকিৎসা পাবার জন্য বিদেশমুখী হতে হবে না বরং বিভিন্ন অনুসলিম রাষ্ট্র থাকে অমুসলিমরা সঠিক চিকিৎসা পাবার জন্য খিলাফত রাষ্ট্রে আসবে।

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
প্রবন্ধ

শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ

ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…

প্রবন্ধ

ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম

১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…

প্রবন্ধ

মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…