রাসুল (সা.) এর অবমাননা এবং আমাদের করণীয়
৭ মিনিটে পড়ুন১০ নভেম্বর ২০২০

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে রাসুল পাঠিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর জন্য সর্বশেষ রাসুল। তিনি সকল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রেরিত নবী। আরবী, অনারবী, সাদা-কালো সবার জন্য তিনি নবী ও রাসুল। তিনি সকল নবী ও রাসূলেরও নেতা। তিনিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি।
সব মানুষ নবীজি (সা.)-এর কাছে ঋণী। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। তিনিই উম্মতকে নিঃস্বার্থ ভালোবেসেছেন। বিশ্বকে মানবতা শিখিয়েছেন। বর্বরতার যুগ সোনালি যুগে পরিণত করেছেন। ঘোর ইসলামবিরোধীও তাঁর কাছে ইনসাফ পেয়েছে, সহযোগিতা পেয়েছে। তিনিই সততা-আমানতদারি শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে অমুসলিমরাও অর্থ-সম্পদ আমানত রেখেছে।
ঈমানদারদের কাছে নবী তাদের জানের চেয়ে প্রিয়।
“শপথ ঐ সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান হতে অধিকতর প্রিয় হব”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩]
“তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হই”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮]
হযরত ওমর (রাঃ) একবার বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি আমার নিকট আমার জীবন ব্যতীত অন্য সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয় । হুযুর (সাঃ) বললেন, কোন ব্যাক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মহব্বত তার নিকট তার জীবনের চাইতেও বেশী না হইবে । হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এখন আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চাইতেও বেশী প্রিয় । (বুখারী)
‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ...।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬)
বর্তমানে বিভিন্নভাবে রাসুল (সা.) এর অবমাননা করা হচ্ছে। তার উপর নবুওয়তী জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের কটূক্তি, অবমাননা এমনকি তার পরিবারের উপর অপবাদ দেওয়া হয়েছে। তার নাম বিকৃতি করা, তার চরিত্র নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা, বিভিন্ন ইবাদাত নিয়ে ব্যঙ্গ করাসহ নানাভাবে পত্রিকা, ব্লগ, ফেসবুক ও বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে অবমাননা করা হচ্ছে।
রাসুল (সা.) এর অবমাননা এবং তাকে বিদ্রূপ করার অধিকার কারো নেই। নবীজি (সা.)-এর ইজ্জত-সম্মানও রক্ষা করা ওয়াজিব। তাতে সামান্যতম শিথিলতার সুযোগ নেই। তাঁর শানে বাজে কথা বলা, তাঁকে অপমান-অপদস্ত করা, কোনো দ্বিনি বা ব্যক্তিগত ব্যাপারে দোষারোপ করা অথবা তাঁর সত্তাগত কোনো বৈশিষ্ট্যে দোষ খোঁজা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা কুফুরি। এ ব্যাপারে চার ইমামই একমত। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
নবীজি (সা.)-এর অবমাননা কুফুরি। মুখে হোক কিংবা ছবি এঁকে। বিশেষত তাঁর ছবি এঁকে প্রকাশ করাও প্রকাশ্য নবিদ্রোহিতা। সুতরাং এ ধরনের বেয়াদব, নবিদ্রোহির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর ফরজ। আর এরূপ কুফুরি কাজ থেকে প্রকাশ্যে তাওবা না করা পর্যন্ত সাধারণ মুসলমানের জন্য তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
তৃতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখন জীবিত। কাব বিন আশরাফ নামক ইহুদি নবীজি (সা.)-এর শানে অমার্জিত কথাবার্তা বলতে থাকে। তাঁর শানে কুৎসামূলক কবিতা আবৃত্তি করে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে। নবীজি (সা.)-কে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ করতে থাকে। ফলে নবীজি (সা.) তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার নির্দেশ দেন। মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৬-৫৭৭, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৫১-৫৭, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৬-১১)
৫ম হিজরি মোতাবেক ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখনো জীবিত। আবু রাফে একজন ধনী ব্যবসায়ী ও ইহুদি। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন কটূক্তি করত। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিত। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবি নবীজি (সা.)-এর কাছে তার ব্যাপারে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলেন। তিনি আবেদন মঞ্জুর করলেন। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৭-৫৭৮, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/২৭৩-২৭৫, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৫৬-১৬০)
রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটাক্ষ ও বিদ্রূপ করার কারণে একজন সাহাবী তার নিজ দাসীকেও হত্যা করেছে এবং রাসুল (সা.) তাকে নিরপরাধ ঘোষণা করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একজন অন্ধ ব্যক্তির একটি উম্মে ওয়ালাদ (যে দাসীর গর্ভে মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে) দাসী ছিল। ঐ দাসী রাসুল (সা.)কে অযথা কটূক্তি করতো। অন্ধ ব্যক্তি তাকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন ও নিবৃত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দাসী কিছুতেই বিরত হতো না। এক রাতে দাসী রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটূক্তি ও গালি-গালাজ করতে লাগলো। তখন লোকটি একটি কোদাল দিয়ে তার পেটে আঘাত করলো এবং তাকে হত্যা করলো। এ অবস্থায় তার একটি সন্তান তার দু’পায়ের মাঝখানে পড়ে গেল এবং রক্তে ভিজে গেল। সকাল বেলা রাসুল (সা.) এর কাছে বিষয়টি জানানো হলে রাসুল (সা.) লোকদের জড়ো করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেছে সে যেন অবশ্যই দাঁড়ায়। তার প্রতি আমারও একটি হক রয়েছে। তখন অন্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে মানুষের কাঁতার ভেদ করে রাসুল (সা.) এর কাছে গিয়ে বসে পড়লো। অতঃপর লোকটি বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ঐ ঘটনার ব্যক্তিটি আমি। আমার দাসীটি আপনাকে গালি-গালাজ করতো এবং অযথা তর্কে লিপ্ত হতো। আমি তাকে বারণ করলেও সে বারণ হতো না। তার থেকে আমার মুক্তোর মতো দু’টি ছেলে রয়েছে। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু গতরাতে সে যখন আপনাকে গালমন্দ করতে লাগলো আমি তখন তাকে একটি কোদাল নিয়ে তার পেটে আঘাত করি এবং তাকে হত্যা করি। রাসুল (সা.) উপস্থিত লোকদের বললেন, তোমরা সাক্ষি থাক! তার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করা হলো (তাকে হত্যা করার জন্য হত্যাকারী অন্যায়কারী হিসেবে বিবেচিত হবে না)।’ (আবু দাউদ ৪৩৬৩, ত্বাবারানী ১১৯৮৪, বুলুগুল মারাম ১২০৪, দারাকুতনী ৮৯)
রাসুলের অবমাননা করার পর যদি সামর্থ থাকার পরও শাস্তি না দেওয়া হয় তবে গোটা জাতি গোনাহে এবং আল্লাহর গযবে পতিত হবে। সরকারের দায়িত্ব তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা। যদি সরকার অবহেলা করে তবে মুসলিমদের দায়িত্ব অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সরকারের উপর চাপ তৈরী করা।
যদি কেউ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ভর্ৎসনা, তিরস্কার বা অপবাদ ইত্যাদি দিয়ে ইসলামের ওপর আঘাত হানে তাহলে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। তার জন্য ভুল স্বীকার করে তাওবা করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করা আবশ্যক। অন্যথায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। নচেৎ সকল মুসলমানের দায়িত্ব হবে তাদের বয়কট করা। আর যারা তাদের সমর্থন করবে তাদেরও একই বিধান। (রদ্দুল মুহতার : ৪/২৩১, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৭/৩০৩)
আমাদের বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেহেতু রাসূল (সা:) এর সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে না তাই আমাদের দায়িত্ব হলো সেই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা নিয়ে আসা যেই ব্যবস্থা রাসূল (সা:) এর সম্মান রক্ষার জন্য সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
হযরত উমর (রা) বলেন, “আল্লাহর শপথ! কুরআন দিয়ে আল্লাহ যতটুকু রক্ষা ও প্রতিহত করেন, রাষ্ট্রশক্তির (খিলাফতের) মাধ্যমে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি রক্ষা ও প্রতিহত করেন।” [কানজুল উম্মাল, হাদীস নং: ১৪২৮৪, তারিখে ইমাম আল-খাত্তাবি]
যদি আজ খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকতো তাহলে মুসলিমদের এমন অপমানজনক ও দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না, নাস্তিকরা উম্মাহর রাসূল (সা:) এর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য কর্মকান্ড করার দু:সাহস দেখাতে পারতো না, কারণ খিলাফত ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষাকারী নয় বরং এটা হচ্ছে ঢালস্বরুপ ও দূর্বোধ্য নিরাপদ এক দূর্গ।
উনিশ শতকের শেষদিকে, ১৮৯০ সালে, ফরাসী লেখক “মারসী ডি বোরেজ” একটি নাটক তৈরি করে ফ্রেঞ্চ কমেডি থিয়েটারে প্রচারের জন্য, যার সমস্ত কাহিনীই রচনা করা হয়েছিল আল্লাহ্ রাসূল (সা:) কে অবমাননা করে। বিষয়টি যখন খলীফা সুলতান ২য় আব্দুল হামিদ (রহ:) এর কানে গেল, তখন তিনি সাথে সাথে ফরাসী সরকারকে সাবধান করে দিলেন যাতে এ নাটকটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোন থিয়েটারে যেন মঞ্চস্থ না হয়। সুতরাং, ফরাসী সরকার তা করতে বাধ্য হয় এবং খলীফার কথামত নাটকটি প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং খলীফার নিকট চিঠিতে উত্তর পাঠায়: “মহামান্য সুলতানের ইচ্ছামত আমরা যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তাতে বিশ্বাস আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হবে”, এবং যখন নাটকটির নির্মাতা ফ্রান্সে সুযোগ না পেয়ে ইংল্যান্ডের অ্যালসিওম থিয়েটারে মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নেয়, এবং যখন বিষয়টি সুলতান আব্দুল হামিদের কানে পৌঁছায়, তিনি সাথে সাথে নাটকটি নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন এবং তা নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয় তৎকালীন পরাশক্তি বৃটেন এ ঘটনার জন্য খলীফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।
বিঃদ্রঃ - কোনো ব্যক্তির প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশান্তে তাকে অপমানের জন্য তার কুশপুত্তলিকা দাহ করার পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়। এ পদ্ধতি বর্তমানে প্রচলিত পাশ্চাত্য রাজনীতিকদের উদ্ভাবিত। তবে নবীজি (সা.)-কে কেউ অপমান করলে অবশ্যই অপমানকারী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উপযুক্ত। এমন লোকের প্রতি শরিয়তসম্মত পন্থায় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রদর্শন ঈমানি কর্তব্য। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫১, ফাতাওয়া ফকীহুল মিল্লাত : ১/৩২৬)
সব মানুষ নবীজি (সা.)-এর কাছে ঋণী। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। তিনিই উম্মতকে নিঃস্বার্থ ভালোবেসেছেন। বিশ্বকে মানবতা শিখিয়েছেন। বর্বরতার যুগ সোনালি যুগে পরিণত করেছেন। ঘোর ইসলামবিরোধীও তাঁর কাছে ইনসাফ পেয়েছে, সহযোগিতা পেয়েছে। তিনিই সততা-আমানতদারি শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে অমুসলিমরাও অর্থ-সম্পদ আমানত রেখেছে।
ঈমানদারদের কাছে নবী তাদের জানের চেয়ে প্রিয়।
“শপথ ঐ সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান হতে অধিকতর প্রিয় হব”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩]
“তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হই”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮]
হযরত ওমর (রাঃ) একবার বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি আমার নিকট আমার জীবন ব্যতীত অন্য সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয় । হুযুর (সাঃ) বললেন, কোন ব্যাক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মহব্বত তার নিকট তার জীবনের চাইতেও বেশী না হইবে । হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এখন আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চাইতেও বেশী প্রিয় । (বুখারী)
‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ...।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬)
বর্তমানে বিভিন্নভাবে রাসুল (সা.) এর অবমাননা করা হচ্ছে। তার উপর নবুওয়তী জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের কটূক্তি, অবমাননা এমনকি তার পরিবারের উপর অপবাদ দেওয়া হয়েছে। তার নাম বিকৃতি করা, তার চরিত্র নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা, বিভিন্ন ইবাদাত নিয়ে ব্যঙ্গ করাসহ নানাভাবে পত্রিকা, ব্লগ, ফেসবুক ও বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে অবমাননা করা হচ্ছে।
রাসুল (সা.) এর অবমাননা এবং তাকে বিদ্রূপ করার অধিকার কারো নেই। নবীজি (সা.)-এর ইজ্জত-সম্মানও রক্ষা করা ওয়াজিব। তাতে সামান্যতম শিথিলতার সুযোগ নেই। তাঁর শানে বাজে কথা বলা, তাঁকে অপমান-অপদস্ত করা, কোনো দ্বিনি বা ব্যক্তিগত ব্যাপারে দোষারোপ করা অথবা তাঁর সত্তাগত কোনো বৈশিষ্ট্যে দোষ খোঁজা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা কুফুরি। এ ব্যাপারে চার ইমামই একমত। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
নবীজি (সা.)-এর অবমাননা কুফুরি। মুখে হোক কিংবা ছবি এঁকে। বিশেষত তাঁর ছবি এঁকে প্রকাশ করাও প্রকাশ্য নবিদ্রোহিতা। সুতরাং এ ধরনের বেয়াদব, নবিদ্রোহির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর ফরজ। আর এরূপ কুফুরি কাজ থেকে প্রকাশ্যে তাওবা না করা পর্যন্ত সাধারণ মুসলমানের জন্য তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
তৃতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখন জীবিত। কাব বিন আশরাফ নামক ইহুদি নবীজি (সা.)-এর শানে অমার্জিত কথাবার্তা বলতে থাকে। তাঁর শানে কুৎসামূলক কবিতা আবৃত্তি করে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে। নবীজি (সা.)-কে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ করতে থাকে। ফলে নবীজি (সা.) তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার নির্দেশ দেন। মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৬-৫৭৭, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৫১-৫৭, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৬-১১)
৫ম হিজরি মোতাবেক ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখনো জীবিত। আবু রাফে একজন ধনী ব্যবসায়ী ও ইহুদি। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন কটূক্তি করত। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিত। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবি নবীজি (সা.)-এর কাছে তার ব্যাপারে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলেন। তিনি আবেদন মঞ্জুর করলেন। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৭-৫৭৮, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/২৭৩-২৭৫, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৫৬-১৬০)
রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটাক্ষ ও বিদ্রূপ করার কারণে একজন সাহাবী তার নিজ দাসীকেও হত্যা করেছে এবং রাসুল (সা.) তাকে নিরপরাধ ঘোষণা করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একজন অন্ধ ব্যক্তির একটি উম্মে ওয়ালাদ (যে দাসীর গর্ভে মালিকের সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে) দাসী ছিল। ঐ দাসী রাসুল (সা.)কে অযথা কটূক্তি করতো। অন্ধ ব্যক্তি তাকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন ও নিবৃত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দাসী কিছুতেই বিরত হতো না। এক রাতে দাসী রাসুল (সা.)কে নিয়ে কটূক্তি ও গালি-গালাজ করতে লাগলো। তখন লোকটি একটি কোদাল দিয়ে তার পেটে আঘাত করলো এবং তাকে হত্যা করলো। এ অবস্থায় তার একটি সন্তান তার দু’পায়ের মাঝখানে পড়ে গেল এবং রক্তে ভিজে গেল। সকাল বেলা রাসুল (সা.) এর কাছে বিষয়টি জানানো হলে রাসুল (সা.) লোকদের জড়ো করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেছে সে যেন অবশ্যই দাঁড়ায়। তার প্রতি আমারও একটি হক রয়েছে। তখন অন্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে মানুষের কাঁতার ভেদ করে রাসুল (সা.) এর কাছে গিয়ে বসে পড়লো। অতঃপর লোকটি বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ঐ ঘটনার ব্যক্তিটি আমি। আমার দাসীটি আপনাকে গালি-গালাজ করতো এবং অযথা তর্কে লিপ্ত হতো। আমি তাকে বারণ করলেও সে বারণ হতো না। তার থেকে আমার মুক্তোর মতো দু’টি ছেলে রয়েছে। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ দিনের সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু গতরাতে সে যখন আপনাকে গালমন্দ করতে লাগলো আমি তখন তাকে একটি কোদাল নিয়ে তার পেটে আঘাত করি এবং তাকে হত্যা করি। রাসুল (সা.) উপস্থিত লোকদের বললেন, তোমরা সাক্ষি থাক! তার রক্ত মূল্যহীন ঘোষণা করা হলো (তাকে হত্যা করার জন্য হত্যাকারী অন্যায়কারী হিসেবে বিবেচিত হবে না)।’ (আবু দাউদ ৪৩৬৩, ত্বাবারানী ১১৯৮৪, বুলুগুল মারাম ১২০৪, দারাকুতনী ৮৯)
রাসুলের অবমাননা করার পর যদি সামর্থ থাকার পরও শাস্তি না দেওয়া হয় তবে গোটা জাতি গোনাহে এবং আল্লাহর গযবে পতিত হবে। সরকারের দায়িত্ব তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা। যদি সরকার অবহেলা করে তবে মুসলিমদের দায়িত্ব অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সরকারের উপর চাপ তৈরী করা।
যদি কেউ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ভর্ৎসনা, তিরস্কার বা অপবাদ ইত্যাদি দিয়ে ইসলামের ওপর আঘাত হানে তাহলে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। তার জন্য ভুল স্বীকার করে তাওবা করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করা আবশ্যক। অন্যথায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। নচেৎ সকল মুসলমানের দায়িত্ব হবে তাদের বয়কট করা। আর যারা তাদের সমর্থন করবে তাদেরও একই বিধান। (রদ্দুল মুহতার : ৪/২৩১, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৭/৩০৩)
আমাদের বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেহেতু রাসূল (সা:) এর সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে না তাই আমাদের দায়িত্ব হলো সেই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা নিয়ে আসা যেই ব্যবস্থা রাসূল (সা:) এর সম্মান রক্ষার জন্য সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
হযরত উমর (রা) বলেন, “আল্লাহর শপথ! কুরআন দিয়ে আল্লাহ যতটুকু রক্ষা ও প্রতিহত করেন, রাষ্ট্রশক্তির (খিলাফতের) মাধ্যমে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি রক্ষা ও প্রতিহত করেন।” [কানজুল উম্মাল, হাদীস নং: ১৪২৮৪, তারিখে ইমাম আল-খাত্তাবি]
যদি আজ খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকতো তাহলে মুসলিমদের এমন অপমানজনক ও দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না, নাস্তিকরা উম্মাহর রাসূল (সা:) এর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য কর্মকান্ড করার দু:সাহস দেখাতে পারতো না, কারণ খিলাফত ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষাকারী নয় বরং এটা হচ্ছে ঢালস্বরুপ ও দূর্বোধ্য নিরাপদ এক দূর্গ।
উনিশ শতকের শেষদিকে, ১৮৯০ সালে, ফরাসী লেখক “মারসী ডি বোরেজ” একটি নাটক তৈরি করে ফ্রেঞ্চ কমেডি থিয়েটারে প্রচারের জন্য, যার সমস্ত কাহিনীই রচনা করা হয়েছিল আল্লাহ্ রাসূল (সা:) কে অবমাননা করে। বিষয়টি যখন খলীফা সুলতান ২য় আব্দুল হামিদ (রহ:) এর কানে গেল, তখন তিনি সাথে সাথে ফরাসী সরকারকে সাবধান করে দিলেন যাতে এ নাটকটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোন থিয়েটারে যেন মঞ্চস্থ না হয়। সুতরাং, ফরাসী সরকার তা করতে বাধ্য হয় এবং খলীফার কথামত নাটকটি প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং খলীফার নিকট চিঠিতে উত্তর পাঠায়: “মহামান্য সুলতানের ইচ্ছামত আমরা যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তাতে বিশ্বাস আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হবে”, এবং যখন নাটকটির নির্মাতা ফ্রান্সে সুযোগ না পেয়ে ইংল্যান্ডের অ্যালসিওম থিয়েটারে মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নেয়, এবং যখন বিষয়টি সুলতান আব্দুল হামিদের কানে পৌঁছায়, তিনি সাথে সাথে নাটকটি নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন এবং তা নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয় তৎকালীন পরাশক্তি বৃটেন এ ঘটনার জন্য খলীফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।
বিঃদ্রঃ - কোনো ব্যক্তির প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশান্তে তাকে অপমানের জন্য তার কুশপুত্তলিকা দাহ করার পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়। এ পদ্ধতি বর্তমানে প্রচলিত পাশ্চাত্য রাজনীতিকদের উদ্ভাবিত। তবে নবীজি (সা.)-কে কেউ অপমান করলে অবশ্যই অপমানকারী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উপযুক্ত। এমন লোকের প্রতি শরিয়তসম্মত পন্থায় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রদর্শন ঈমানি কর্তব্য। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫১, ফাতাওয়া ফকীহুল মিল্লাত : ১/৩২৬)
✦আরও পড়ুন
✦ প্রবন্ধ ✦শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
প্রবন্ধ
শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ
ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…
✦ প্রবন্ধ ✦ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
প্রবন্ধ
ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম
১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…
✦ প্রবন্ধ ✦মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
প্রবন্ধ
মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা
হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…