মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
প্রবন্ধ

আল ওয়ালা ওয়াল বারা

৬ মিনিটে পড়ুন২২ আগস্ট ২০২০
আল ওয়ালা ওয়াল বারা
আল ওয়ালা ওয়াল বারা

‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইসলামি আক্বীদার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধান ভিত্তি। শাইখ আহমাদ ইবনে আতিক (রহ) বলেন:

“তাওহীদের বাধ্যবাধকতা এবং এর বিপরীতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টির পরে আল্লাহ কিতাবে অন্য কোন বিষয়েই ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা-র চেয়ে বেশি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অন্য কোন বিষয় এতো পরিষ্কারভাবে ব্যখ্যা করা হয়নি।”

মুসলিমরা বর্তমানে এমন একটি কঠিন সঙ্কটপূর্ন সময় পার করছে যখন ইসলামের অনেক মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয় বিস্মৃত হয়েছে, ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিংবা অবহেলা করা হয়েছে। ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা-র বিষয়টি সে ধরনেরই একটি বিষয়। এ কারণে বহু মুসলিমই এখন আর মুমিন ও কাফেরের পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপারে সচেতন নয়। এর ফলশ্রতিতে বহু মুসলিমের ঈমান/বিশ্বাস এখন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কাফেরদের সাথে তারা গভীর বন্ধুত্ব করছে – আচরণ, চালচলন ও আকাক্স¶ার দিক থেকে কাফেরদের অনুকরণ করছে।

ওয়ালা’ (আনুগত্য) বলতে আল্লাহ, তার নবী-রাসূলগণ ও মুমিনদের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ন ভালোবাসা ও সহযোগিতা প্রকাশকে বোঝায়। অন্যদিকে বারা’ (সম্পর্কচ্ছেদ) বলতে মিথ্যা ও মিথ্যার অনুসারী মানুষদের সাথে শত্র“তা পোষন ও সম্পর্কচ্ছেদ বোঝায়। আর প্রকৃতপক্ষে এসবের উদ্ভব ঈমানের সবচেয়ে মৌলিক বিষয়গুলো থেকেই।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র অর্থের সাথে ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা-র বিষয়টি এমন গভীরভাবে সম্পর্কিত যে, এই বিষয়টি কোনো ভূল করলে মূল কালিমার অর্থটিও ভূলভাবে বোঝা হবে।

১. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র অর্থ:

এর অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই। সুতরাং এর মাধ্যমে অন্য সব উপাস্যের উপাসনা বাতিল করা হয়েছে এবং একমাত্র আল্লাহর উপাসনাকেই সত্যায়ন করা হয়েছে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে অš—রের সুখ নেই বা পূর্ন কোনো আনন্দ নেই। আল্লাহর পাশাপাশি যেসব জিনিসকে ভালোবাসা হয়। সেগুলোকে পুরোপুরি ছুড়ে না ফেলা পর্যš— আল্লাহর প্রতি [প্রকৃত] ভালোবাসা পোষন করা কখনোই সম্ভব নয়। এটাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত বা¯—বতা এবং এটাই আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইবরাহিম (আ)-সহ অন্য সব নবী-রাসূলদের দ্বীন।

তাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত বা¯—বতা হল আল্লাহকে ভালবাসা এবং তিনি যেসব কাজ ভালোবাসেন ও যেসব কাজে সন্তুষ্ট হন সেসব কাজ করা।

আল হাফিয আল হাকামী (রহ) বলেন, কোনো ব্যক্তি যে তার প্রভুকে ভালোবাসে তার নিদর্শন হলো:

(1 সে ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর পছন্দকেই প্রাধান্য দেয়, এমনকি যদিও সেটা তার নিজের ইচ্ছার বিপরীত হয়;
(2) আল্লাহ যেটাকে ঘৃণা করে, সেও সেটাকে ঘৃণা করে, এমনকি যদিও সেটা তার নিজের ইচ্ছার অনুগামী হয়;
(3) আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)-এর মিত্রদের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ ভালবাসা ও সহযোগিতা প্রদর্শন করা;
(4) আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)-এর প্রতি যারা শত্র“তা প্রদর্শন করে তাদের প্রতি শত্র“তা প্রদর্শন করা;
(5) আল্লাহর রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করা; এবং
(6) তাঁর দেখানো পথকে/হেদায়েতকে গ্রহণ করা।

২. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র ঘোষনা করা মানে কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র প্রয়োগ থাকা।

* কালিমার মানে হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন, তাঁর কিতাব, তাঁর নবী রাসূল ও তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ ইবাদতকারীদের প্রতি ওয়ালা (নিষ্ঠাপূর্ন ভালোবাসা ও সহায়তা) প্রদর্শন করা এবং এর পাশাপাশি তাঁদেরকেই ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করা:

 নিশ্চয়ই তোমদের সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী তো আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনরা। [সুরা মায়িদা: ৫৫]

* কালিমার মানে হচ্ছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাসনা করে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা ও যেসব জিনিসকে আল্লাহর পাশাপাশি উপাসনা করা হয় সেগুলোর প্রতি শত্র“তা প্রদর্শন করা।

 ইবরাহিম ও তার সাথীদের মধ্যে তোমাদের জন্য এক উত্তম আদর্শ রয়েছে। যখন সে তার স¤প্রদায়কে বলল, আমরা তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া উপাস্য হতে মুক্ত। আমরা তোমাদের মানি না, চিরদিন তোমাদের ও আমাদের মাঝে শত্র“তা থাকবে। যত¶ণ না তোমরা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করবে। [মুমতাহিনা: ৪]

 সে ব্যক্তি তাগুতকে বিশ্বাস না করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে ব্যক্তি এক শক্ত রশি ধারণ করে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। [বাকারা: ২৫৬]

শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব (রহ/আল্লাহ তাকে ¶মা করক) বলেন, জেনে রেখো, আল্লাহর পাশাপাশি যেসব জিনিসের উপাসনা করা হয় সেসব জিনিসকে পরিত্যাগ না করলে কোনো ব্যক্তি ঈমানদার হিসেবে গন্য হতে পারবে না। এই আয়াতই তার প্রমাণ।

* কালিমার মানে হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি ভালোবাসা পোষন করা:

 তোমার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে তা অনুসরণ কর। এবং তাঁকে ছেড়ে অন্য কোন বন্ধু ও সাহায্যকারীকে অনুসরণ করো না। [সুরা আরাফ: ৩]

* কালিমার মানে হচ্ছে ইসলামবিরোধী আইন ও রায়ের প্রতি শত্র“তা পোষন করা: [সুরা মায়েদা:৫]

* কালিমার মানে হচ্ছে ইসলাম ছাড়া বাকি অন্য সব দ্বীন ত্যাগ করা:

 যে ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন অন্নেষণ করে আ কখনো কবুল করা হবে না এবং সে পরকালে ¶তিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [আলে ইমরান: ৮৫]

# ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কিছু বিষয়কে/জিনিসকে বাতিল করে, আবার কিছু বিষয়কে সত্যায়ন করে। এটি চারটি বাতিল করে: আলিহাহ, তাওয়াগীত, আনদাদ এবং আরবাব।

আলিহাহ: কেউ যদি কোনো বস্তুও ওপর আশা ও ভয় পোষণ করে এই ভেবে যে, ওই বস্তুটি নিজে নিজেই কোনো লাভ বা ¶তি ঘটাতে পারে, তাহলে ওই বস্তুটিকে আল্লাহর পাশাপাশি উপাস্য বানিয়ে ফেলা। তাই কালিমা এক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুকেই বাতিল করে দেয়।

 আল্লাহ আপনাকে কোন কষ্টে ফেললে তিনি ছাড়া মুক্ত করার কেউ নেই। এবং তিনি মঙ্গল চাইলে তা রদ করার কেউ নেই। [সুরা ইউনুস: ১০৭]

তাওয়াগীত: যাকে উপাসনা করা হয় ও যে এতে সন্তুষ্ট, কিংবা যারা কিছু ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য দাবি করে, যেমন- গায়েব জানার দাবি করা, অথবা আল্লাহর আইনের বিপরীত আইন প্রণয়ন করাকে বৈধ মনে করা, এ ধরনের লোকেরাই সীমালক্সঘনকারী (তাওয়াগীত)।

 প্রত্যেক জাতির কাছে কোন না কোন রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর। [সুরা নাহল: ৩৬]

আনদাদ: যা কিছু কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে ফিরিয়ে রাখে, যেমন- পরিবার, সন্তান বা বাড়িঘর, এসব আল্লাহর প্রতিদ্ধন্দী (আনদাদ) হয়ে দাড়ায়।

 আর মানুষের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহকে ছাড়া অন্যকে আল্লাহর প্রতিদ্ব›িদ্ব হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাদেরকে এমনভাবে ভালোবাসে যেভাবে আল্লাহকে ভালোবাসা উচিত। [সুরা বাকারা: ১৬৫]

আরবাব: যারা জেনেশুনে আল্লাহর আইনের বিরদ্ধে রায় দেয় ও সেসব রায় কার্যকর করা হয়, তাহলে তাদেরকে আল্লাহর পাশাপাশি প্রভু (আরবাব) বানিয়ে ফেলা হয়।

 তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে পাদ্রী ও বৈরাগীদেরকে তাদের রব বানিয়ে রেখেছে। [সুরা তাওবাহ: ৩১]

এই কালিমা চারটি বিষয়ের/জিনিসের সত্যতা ঘোষনা করে/¯^ীকৃতি দেয়:

নিষ্ঠা (ইখলাস): আল্লাহই হবেন আমাদের ইবাদতের উদ্দেশ্য এবং আমাদের সকল ইবাদত কেবল তারই প্রতি নিবেদিত হবে।

 তাদেরকে এ ছাড়া আর অন্য কোন কিছুই আদেশ করা হয়নি যে তারা বিশুদ্ধ চিত্তে ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করবে, ... । [বাইয়িনাহ: ৫]

ভালোবাসা: যে কোনো কিছুর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসতে হবে।

 কিন্তু মুমিনরা আল্লাহর ভালোবাসায় দৃঢ়। [বাকারা: ১৬৫]

ভয় ও আশা: শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় ও আশা কেবল আল্লাহর প্রতিই থাকতে হবে।

 তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো [এবং আমার অবাধ্য হওয়ার ব্যাপারে সাবধান হও], যদি তোমরা মুমিন হও। [আলে ইমরান: ১৭৫]

 অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ লাভের আশা পোষণ করে সে যেন সৎকাজ করতে থাকে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে অংশীদার না বানায়। [কাহফ: ১১০]

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব (আল্লাহ তাকে ¶মা কর“ক) বলেন, আমরা যদি এটা পরিষ্কারভাবে বুঝে থাকি তাহলে আমরা দেখব যে, দ্বীন পালনের দাবি করে এমন অনেকেই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত অর্থ বোঝেনি। [প্রথম দিককার মুসলিমরা নির্যাতন , বন্দিত্ব, প্রহার ও ইথিওপিয়ায় হিজরতের সময যে অবর্ণনীয় ধৈর্য ধারণ করেছে, এটার সাথে যদি আমরা মনে রাখি যে, রাসূল (সা) মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন, তাহলে বুঝতে হবে উপায় থাকলে রাসূল (সা) অবশ্যই তার সাহাবীদের বিপদের বোঝা কমানোর পথ বের করতেন।

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
প্রবন্ধ

শীঘ্রই ইহুদিরা পরাজিত হবে এবং জেরুজালেম ইসলামী খিলাফতের রাজধানী হবে ইনশাআল্লাহ

ফিলিস্তিন হল মসজিদ আল-আকসার বাড়ি, মক্কার মসজিদ আল-হারামের পরে পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। এটি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের…

প্রবন্ধ

ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায় প্রথম

১৫২টি দেশের ১,২০০ টিরও বেশি শহরের ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ রাজধানী ঢাকা বিশ্বের ধীরতম শহরের তালিকায়…

প্রবন্ধ

মুসলমানদের জন্য রবিউল আউয়ালের শিক্ষা

হে মুসলমানগণ! রবিউল আউয়াল মাসে, সমস্ত মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ, চূড়ান্ত নবী ও রসূল হিসাবে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিযুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। আবু আল-হাসান…