মূল লেখায় যান
হিকমাহHikmah
খিলাফতের ইতিহাস

চুরির অপরাধে অভিযুক্ত এক বৃদ্ধা অতঃপর কাজীর দরবারে-(খলিফা হারুন অর রশিদের ন্যায় বিচারের এক অসাধারন দৃষ্টান্ত

৩ মিনিটে পড়ুন১৬ জুন ২০১৮
চুরির অপরাধে অভিযুক্ত এক বৃদ্ধা অতঃপর কাজীর দরবারে-(খলিফা হারুন অর রশিদের ন্যায় বিচারের এক অসাধারন দৃষ্টান্ত
সিরিয়ার একটি শহরের নাম রাকা। সেখান থেকে খলিফা হারুনুর-রশিদের নিকট চিঠি আসলো। চিঠিতে লেখা ছিলঃ শহরের বিচারক এক মাস যাবত অসুস্থ, বিচার কাজ স্থবির হয়ে আছে। খলিফা যেন দ্রুত ব্যবস্থা করেন । খলিফা চিঠির জবাব পাঠালেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক আসবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিচারক এসে যোগ দিলেন।

বিচার কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রহরীরা একজন বৃদ্ধা মহিলাকে আসামী হিসেবে দরবারে হাজির করলেন। তার অপরাধ ছিল তিনি শহরের এক রেস্তোরাঁ থেকে কিছু রুটি আর মধু চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন।

বিচারকঃ আপনি চুরি করেছেন?
– জ্বি।
– আপনি কি জানেন চুরি করা কতো বড় অপরাধ ও পাপ?
– জ্বি।
– জেনেও কেন চুরি করলেন?
– কারণ আমি গত এক সপ্তাহ যাবত অভুক্ত ছিলাম । আমার সাথে এতিম দুনাতিও না খেয়ে ছিল। ওদের ক্ষুদারত চেহারা ও কান্না সহ্য করতে পারিনি তাই চুরি করেছি। আমার আর এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না হুজুর।

বিচারক এবার পুরো দরবারে চোখ বুলালেন। বললেন কাল যেন নগর, খাদ্য, শরিয়া, পুলিশ প্রধান ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যাক্তিগন সবাই উপস্থিত থাকেন । তখন এর রায় দেওয়া হবে।

পরদিন সকালে সবাই হাজির হলেন। বিচারকও যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে রায় ঘোষণা করলেন-“বৃদ্ধা মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০টি চাবুক, ৫০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা আর অনাদায়ে এক বছর কারাদণ্ড ধার্য করা হলো। তবে অকপটে সত্য বলার কারণে হাত কাটা মাফ করা হলো। বিচারক প্রহরীকে চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিচে নেমে ঐ বৃদ্ধা মহিলার পাশাপাশি দাঁড়ালেন।

বিচারক বললেন যে নগরে একজন ক্ষুধার্তবৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হয় সেখানে তো সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে। আমি যেহেতু তাঁর অধীনে চাকরি করি তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হউক। আর এটাই হলো বিচারকের আদেশ । আদেশ যেন পালন করা হয় এবং বিচারক হিসাবে আমার উপর চাবুক মারতে যেন কোনো রকম করুণা বা দয়া দেখানো না হয়।

বিচারক হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুই হাতে পর পর ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের আঘাতের ফলে হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঐ অবস্থায় বিচারক পকেট থেকে একটি রুমাল বের করলেন। কেউ একজন বিচারকের হাত বাঁধার জন্য এগিয়ে গেলে বিচারক নিষেধ করেন। এরপর বিচারক বললেন “যে শহরে নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধান ও অন্যান্য সমাজ হিতৈষীরা একজন অভাব গ্রস্হ মহিলার ভরন-পোষণ করতে পারেন না, সেই নগরে তারাও অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমান ভাবে তাদেরকে মারা হোক।”

এরপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের উপর ৫০ টি রৌপ্য মুদ্রা রাখলেন। তারপর বিচারপতি উপস্থিত সবাইকে বললেন “যে সমাজ একজন বৃদ্ধমহিলাকে চোর বানায়, যে সমাজে এতিম শিশুরা উপবাস থাকে সে সমাজের সবাই অপরাধী। তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো।”

এবার মোট ৫০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রাথেকে ১০০ দিণার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানাবাবদ রেখে বাকি ৪০০টি রৌপ্য মুদ্রা থেকে ২০টি চুরি যাওয়া দোকানের মালিককে দেওয়া হলো। বাকি ৩৮০ টি রৌপ্য মুদ্রা বৃদ্ধা মহিলাকে দিয়ে বললেন “এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য। আর আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে আসবেন। খলিফা হারুনুর রশিদ আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।”

একমাস পরে বৃদ্ধা খলীফার দরবারে গিয়ে দেখেন; খলীফার আসনে বসা লোকটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে । মহিলা ভয়ে ভয়ে খলীফার আসনের দিকে এগিয়ে যান। কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন লোকটি সেদিনের সেই বিচারক। খলীফা চেয়ার থেকে নেমে এসে বললেন—আপনাকে ও আপনার এতিম দুনাতিকে উপোস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আজ দরবারে ডেকে এনেছি প্রজা অধিকারসমুন্নত করতে না পারা অধম এই খলীফাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। আপনি দয়াকরে আমাকে ক্ষমা করুন।

✦আরও পড়ুন

সব দেখুন
কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ
খিলাফতের ইতিহাস

কুরআনের সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পন্ডিতের ইসলাম গ্রহণ

আব্বাসীয় খলীফা মামূনুর রশীদের দরবারে মাঝে মাঝে শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হত। এতে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ে বিদগ্ধ পন্ডিতগণ…

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!
খিলাফতের ইতিহাস

গর্ব করার মত এক ইতিহাস!!

ওসমানীয় খেলাফত চলছে তখন, ১৮৪৫ সাল। খলিফা আব্দুল মাজিদ ইস্তাম্বুলের মসনদে। এসময়ে এসেও ইউরোপের অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিলনা, বিভিন্ন আর্থিক-সামাজিক…

হযরত ওমরের চুমু!
খিলাফতের ইতিহাস

হযরত ওমরের চুমু!

হযরত ওমরের শাসন চলছে। শুরু হয়েছে রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যুদ্ধে বন্দি হয়েছেন অনেক মুসলিম সৈনিক। সঙ্গে বন্দি একজন সাহাবিও। রাসূল (সাঃ) - এর…